হ্যাচারি মালিকের অতি লোভ : পোল্ট্রি খামারিদের ক্ষোভ

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট

গত ১৯ এপ্রিল ২০১৭ সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি ছোট সংবাদ অনেক পাঠককে ভাবিয়ে তুলেছে। ’হ্যাচারি থেকে বাচ্চা কিনবে না প্রোল্ট্রি খামারিরা’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে হ্যাচারি থেকে বাচ্চা কেনা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে পোল্ট্রি খামারিরা। জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে পোল্ট্রি ও পেশাজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার মোহাম্মদ মহসিন ২৩ এপ্রিল থেকে বাচ্চা কেনা বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, ’প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির বাচ্চার উৎপাদন খরচ নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে ৩৪টাকা ও ৩০টাকা। কিন্তু হ্যাচারি মালিকরা এক দিনের লেয়ার বাচ্চা ১১০ টাকায় ও ব্রয়লার বাচ্চা ৭২টাকায় বিক্রি করছে। পাশের দেশ ভারত থেকে আনলে ব্রয়লার বাচ্চা প্রতি খরচ হয় ৩০টাকা,চীন থেকে আনলেও ৬০টাকার বেশী খরচ হয় না। কিন্তু আমাদের দেশের বাইরে থেকে আনতে দিচ্ছে না সরকার। যে কারণে বাধ্য হয়ে বেশি দাম দিয়ে হ্যাচারি মালিকদের কাছ থেকে মুরগির বাচ্চা কিনতে বাধ্য হচ্ছে।’ সংবাদ সম্মেলনে মুরগির খাবার,ওষুধসহ অন্যান্য জিনিসের দামও মর্জিমতো বৃদ্ধি করার অভিযোগ তোলেন খামারিরা। আসন্ন বাজেটে পোল্ট্রির জন্য প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন,উন্নতমানের ল্যাব নির্মাণ,ডিম ও মাংস সংরক্ষণাগার, প্রান্তিক খামারিদের যৌথ মালিকানায় ফিড মিলে বরাদ্দ রাখাসহ পোল্ট্রিতে বীমা প্রথা চালু ও ট্যাক্স কমানোর দাবি জানান তারা।
দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকা ১২ মার্চ ২০১৬ ”ধ্বংসের মুখে পোল্ট্রী শিল্পঃ হতাশ ব্যবসায়ী ও খামারিরা” শিরোনামে জনগুরুত্বসম্পর্ন একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিল। তারা সেই সংবাদ-প্রতিবেদনে লিখেছিল, পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকবার প্রতিবাদ সভা করে দোকান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। দেশের লক্ষ লক্ষ গরীব অসহায় খামারিরা বার বার লোকসান দিতে দিতে সর্বহারা হয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বাকীতে নেওয়া পোল্ট্রি খাদ্য,ঔষধ ও বাচ্চার টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়ে। পোল্ট্রি খামারিদের মধ্যে দুভিক্ষবস্থা বিরাজ করছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরীব অশিক্ষিত খামারিরা তাদের এ মর্মান্তিক অবস্থার জন্য দায়ী কে বা কারা না জানলেও ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদ সভা করে সরাসরি দায়ী করেছে মুরগীর বাচ্চা ও খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানী সি,পি, কাজী, প্যারাগন, নাহার, নিরিবিলি, প্রভিটা, গাউছিয়া, আফতাব, নারিস, আগা, ব্র্যাকসহ অন্যান্য কোম্পানীগুলোকে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ হল লেয়ার ও বয়লার বাচ্চার উৎপাদন খরচ ২০/২৫ টাকা হলেও উল্লেখিত কোম্পানীগুলো ডিলার তথা ব্যবসায়ীদের দর নির্ধারণ করে দিচ্ছে ৬০টাকা ও ৯০ টাকায় বিক্রী করতে। তা সময় সময় কমবেশীও করা হয়। তাদের তৈরী পোল্ট্রি খাদ্যের মূল্যও উৎপাদন খরচের চেয়ে অত্যাধিক বেশী লাভ করে রাখা হয়। কিন্তু‘ মুরগি ও ডিমের দাম তেমন বাড়ে নাই। কিছু নগদ,কিছু বাকীতে খামারিরা ব্যবসায়ী বা ডিলারের কাছ থেকে বাচ্চা ও খাদ্য নিয়ে যত্নসহকারে লালন পালন করে বিক্রয়যোগ্য হলে মুরগি বা ডিম বিক্রয় করে লাভ তো হয় না ডিলারের বাকী টাকাও পরিশোধ করতে পারে না। যারা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে খামার করেছে তাদের অবস্থা আরো ভয়াবহ। এতে করে লোকসান দিতে দিতে খামারিরা সর্বহারা হয়ে ডিলার বা ব্যবসায়ীদের সাথে বাকী টাকা পরিশোধ করতে না পারার লজ্জায় দেখাও করছে না। প্রান্তিক খামারিদের অবস্থা বুঝতে পেরে ব্যবসায়ীরা কোম্পানীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করার চেষ্টা করেছে। অভিযোগ হল এখন হ্যাচারি কোম্পানীগুলো সিন্ডিকেট করে নিজেরাই বড় বড় খামার তৈরী করে নিজেরা নিজেদের উৎপাদিত বাচ্চা ও খাদ্য ব্যবহার করছে। সাধারণ খামারিদের জন্য বিক্রয়মূল্য এত বেশী নির্ধারণ করা হচ্ছে যাতে তারা লোকসান দিতে দিতে খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। কোটি কোটি টাকার মালিক বড় বড় কোম্পানীগুলো সিন্ডিকেট করে সকল পোল্ট্রি সংক্রান্ত ব্যবসাকে মনোপলি করে ফেললে অল্প পুজির ছোট খামারিদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। এর ফলে খামারিদের কাছ থেকে বাকী পাওনা টাকা না পেয়ে ও ক্রয়বিক্রয় আশংকাজনকভাবে কমে যাওয়ায় পোল্ট্রি ব্যবসায়ীদের অবস্থাও খারাপ হয়েছে। অপ্রিয় সত্য হল, সে কোম্পানীগুলো তাদের উৎপাদিত মুরগীর বাচ্চা ও খাদ্য বাজারজাত করার জন্য প্রতিনিধির মাধ্যমে নিজেরা উৎসাহিত করে অধিকাংশ প্রান্তিক খামারিকে বাড়ীর আশেপাশে খামার স্থাপনে প্রলুব্ধ করেছিল। পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানের ২২ পরিবারের মনোপলি ব্যবসা ও শোষনের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিন্তানের বাঙ্গালীরা আন্দোলন করতে করতে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তান অঞ্চলে পাকিন্তানের কবর রচিত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন স্বাধীন বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ গরীব খামারির রক্ত শোষকের ভুমিকায় চলে আসা পরিবারগুলোর বা কোম্পানীগুলোর বিরুদ্ধে কি আবার অন্য ধরনের আন্দোলন শুরু হওয়ার অশনি সংকেত বা পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না? সাগরে বড় মাছগুলো ছোট মাছ খেয়ে যেমন আরো বড় হয়,ছোট ছোট খামারিদের খেয়ে বড় বড় কোম্পানীগুলো আরো বড় হচ্ছে?
ব্যাংক ঋণের উপর সর্বোচ্চ সুদের হার নির্ধারণের মত প্রোল্ট্রির বাচ্চা ও খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পনীগুলো লাভের সর্বোচ্চ হার বা পরিমান ও মুল্য নির্ধারণ করতে পারে সরকার। সরকার একটু সুদৃষ্টি দিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিলে লক্ষ লক্ষ পোল্ট্রি খামারি বেঁেচ যাবে। সময় মত ব্যবস্থা না নিলে লুট হওয়া ব্যাংকের টাকার মত পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে বলে মনে করেন অভিজ্ঞ মহল। রোগী মারা যাওয়ার পরে ডাক্তার আনার দরকার নাই। অঘটন ঘটার পর তদন্ত কমিশন গঠন করে কোন লাভ হয় না। দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত উল্লেখিত সংবাদটি নিয়ে বিগত ২০/৩/১৬ইং তারিখ ’অতিথি কলামে’ একটি বিশেষ কলামও দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
এক বছর পরে পোল্ট্রি খামারিদের একই ধরনের প্রতিবাদ,সংবাদ সম্মেলন প্রমান করে সরকার বা রাষ্ট্র এ দেশের গরীব প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিদের সমস্যা নিয়ে ভাবার সময় পায় নাই বা গুরুত্ব দেয় নাই। এতে কোটিপতি ধনী পোল্ট্রি হ্যাচারি মালিক ও পোল্ট্রি খাদ্য উৎপাদনকারী-ব্যবসায়ীদের স্বার্থই সুরক্ষিত হয়েছে, এখনও হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক গরীব খামারী লোকসান দিতে দিতে সর্বহারা হয়ে গেছেন। কি করলে পোল্ট্রি খামারিরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে?
লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সভাপতি, কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.