মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ  শেখ মুজিব কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন থেকে একটি সংগ্রাম এবং সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতা অর্জনকারী বাংলাদেশের স্থপতি। তিনি একটি দেশ ও একটি জাতির ইতিহাস। তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।

মুজিব সামরিক শাসনকে পিছু হটিয়ে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং বাংলা এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তার অবদানের জন্য ভারতবর্ষীয় এবং বিশ্বজুড়ে সকল বাংলাভাষীর কাছে স¤পূজনীয়। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা রেডিও সার্ভিস পরিচালিত বিশ্বব্যাপী শ্রোতা জরিপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালে একটি মুক্তি শিবিরে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে আপনি কেন যুদ্ধ করছেন ?  জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দেন, আমরা শেখ মুজিবের জন্য অস্ত্র ধরেছি।

তিনি সাধারণ মানুষের বন্ধু। জাতির কাছে তিনি পিতা। পৃথিবীর সকলের কাছে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। সাংবাদিক শেরিল ডান বলেছেন, বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হলেন একমাত্র নেতা যিনি, রক্তে, বর্ণে, ভাষায়, সংস্কৃতিতে এবং জন্মে একজন পূর্ণাংগ বাঙালি। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অসীম। তার কন্ঠ বজ্র কঠিন। তার মোহনীয় ব্যক্তিত্বে সহজেই আবিষ্ট হয় সাধারণ মানুষ। তার সাহস এবং অনুপ্রেরনাশক্তি তাকে এই সময়ের অনন্য সেরামানব এ পরিণত করেছে। নিউজউইক পত্রিকা তাকে “রাজনীতির কবি” হিসাবে আখ্যায়িত করেছে।

বৃটিশ মনিবাধিকার আন্দোলনের নেতা, প্রয়াত লর্ড ফেনার ব্রকওয়ে বলেছিলেন,  বলতে গেলে, শেখ মুজিব হলেন জর্জ ওয়াশিংটন, মহাত্মা গান্ধী এবং ডি ভেলেরা এর থেকেও মহান নেতা।

১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে নন এ্যালাইনড্ সন্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সাথে কোলাকুলী করার সময়ে কিউবার নেতা ফিডেল ক্যাষ্ট্রো বলেন, “ আমি হিমালয় দেখি নাই, কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব এবং সাহসীকতায় তিনি হিমালয়সম। আর এভাবেই আমার হিমালয় দর্শন।

বাংলা, বাঙালির কৃষ্টি এবং ইতিহাস রক্ষায় সবার আগে যিনি আন্দোলনে নেমেছেন, তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে বঙ্গবন্ধু বলেন, “স্যার আপনি দেখবেন ওরা পূর্ববাংলা নামের পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে, আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন। বাংলা শব্দটার একটি নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য। আপনারা এই নাম আমাদের জনগণের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পরিবর্তন করতে পারেন। আপনারা যদি ঐ নাম পরিবর্তন করতে চান তাহলে আমাদের বাংলায় আবার যেতে হবে এবং সেখানকার জনগণের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে তারা নাম পরিবর্তনকে মেনে নেবে কিনা। এক ইউনিটের প্রস্তাবটা গঠনতন্ত্রে অন্তভুক্ত হতে পারে। আপনারা এই প্রশ্নটাকে এখনই কেন তুলতে চান? বাংলাভাষাকে, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে কি হবে? যুক্ত নির্বাচনী এলাকা গঠনের প্রশ্নটারই কি সমাধান? আমাদের স্বায়ত্তশাসন সম্বন্ধেই বা কি ভাবছেন? পূর্ববাংলার জনগণ অন্যান্য প্রশ্নগুলোর সমাধানের সাথে এক ইউনিটের প্রশ্নটাকে বিবেচনা করতে স্থপতি। তাই আমি আমার ঐ অংশের বন্ধুদের কাছে আবেদন জানাবো তারা যেন আমাদের জনগণের ‘রেফারেন্ডাম’ অথবা গণভোটের মাধ্যমে দেয়া রায়কে মেনে নেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর এই দাবিকে অগ্রাহ্য করেই পাকিস্তানী শাষক গোষ্ঠি বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তান ডাকতে থাকে। অনেক বছর পরে, প্রহসনমূলক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাবার পরে বঙ্গবন্ধু এই বঞ্চনা থেকে মুক্তির জন্য প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, “এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইতেছে। … একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোন কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। … জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে তৎকালীন রেস কোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ভাষন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডাক। রেসকোসের্র জনসমুদ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা’। ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে শৃংখল মুক্তির আহŸান জানিয়ে ঘোষণা করেন, “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইন শাহ আল্লাহ্।”

মাচের্র ২৩ তারিখ ছিল পাকিস্তানের দিবস। অথচ ঐদিন পূর্ব বাংলার সকল বাসস্থান- অফিসে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত পতাকা উত্তোলন করা হয়। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাসসস্তানের বাইরে হাজারো উৎফুল জনতার উপস্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ছাত্র জনতার মার্চপাস্টে সালাম গ্রহণ করেন। নিজ গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে ঢাকার রাজপথ পেড়িয়ে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে যান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে আলোচনার জন্য।

মূলত ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুই রাষ্ট্রপরিচালনা করেছেন। ১৬ মার্চ ঢাকায় ক্ষমতা হসস্তানতের প্রশ্নে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক শুরু হয়। আলোচনার জন্য জনাব ভুট্টোও ঢাকায় আসেন। ২৪ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া-মুজিব-ভুট্টো আলোচনা হয়। ২৫ মার্চ আলোচনা ব্যর্থ হবার পর সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করেন। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। আক্রমণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা রাইফেল সদর দফতর ও রাজারবাগ পুলিশ হেড কোয়ার্টার।

বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন : ‘সম্ভবতঃ এটাই আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনসাধারণকে আহ্বান জানাচ্ছি তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যাই তোমাদের হাতে আছে তার দ্বারাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দখলদার সৈন্যবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে হবে। যতক্ষণ না পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ ব্যক্তি বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবে, তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।

এই ঘোষণা বাংলাদেশের সর্বত্র ট্রান্সমিটারে প্রেরিত হয়। এর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বাংলায় নিন্মলিখিত একটি ঘোষণা পাঠান : “পাকিত্মান সেনাবাহিনী অতর্কিতভাবে পিলখানা ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে, আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোন আপস নাই। জয় আমাদের হবেই। পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রকে বিতাড়িত করন। সকল আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক প্রিয় লোকদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করন। জয় বাংলা।”

বঙ্গবন্ধুর এই আহŸান বেতার যন্ত্র মারফত তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ ব্যবস্তায় সারাদেশে পাঠানো হয়। রাতেই এই বার্তা পেয়ে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর সেনানিবাসে বাঙালি জওয়ান ও কর্মকর্তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা প্রচার করা হয় গভীর রাতে। স্বাধীনতার ঘোষণা দেবার অপরাধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১-১০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২ নং বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যায় এবং ২৬ মার্চ তাকে বন্দি অবস্তায় পাকিস্তান নিয়ে যাওয়া হয়। ২৬শে মার্চ জেঃ ইয়াহিয়া এক ভাষণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করে।

২৬ মার্চ চট্টগ্রাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে বিপালবী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (মুজিবনগর) বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধশেষে ১৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মস¤র্পণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়। বাংলাদেশ লাভ করে স্বাধীনতা।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের সরকার আর্ন্তজাতিক চাপে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ঢাকায় পৌঁছলে তাকে অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। ১২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ভারতীয় মিত্র বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষর করেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হয়। অতি অল্প সময়ে প্রায় সব রাষ্ট্রের স্বীকৃতী আদায় ও জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

জাতিসংঘে তিনিই প্রথম ব্যক্তিত্ব, যিনি তার স্বপ্ন, তার জনগণের আকাক্সক্ষার কথা বাংলায় শোনালেন বিশ্বনেতাদের। এই মহান নেতার জীবনকে কোন রং বা বর্ণ মালায় একত্রীকরন করা যায় না। কারণ মুজিব তার সৃষ্টির চেয়েও মহান। তিনি আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যতের অনুপ্রেরনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর আদর্শ এবং উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করা বাঙালিজাতির মহান কর্তব্য। তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী। তার স্মৃতি আমাদের ভবিষ্যতের পথের দিশা।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.