বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল বাড়ছেই: জাতিসংঘ

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ মাত্র ক’দিন আগেও মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের প্রবেশে বাংলাদেশকে অনুরোধ জানিয়েছিল জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, সীমান্তে আটকে এসব অসহায় মানুষকে নো ম্যানস ল্যান্ড’এ কিংবা মিয়ানমারে ফেরত পাঠালে তাদের মৃত্যুর মুখেই ঠেলে দেয়া হবে। এমন আহ্বানের পাশাপাশি বিশ্ব মহলকেও রোহিঙ্গাদের সাহায্যে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছিল জাতিসংঘ।

অবশ্য বিশ্ব মহল এদের সাহায্যে এগিয়ে না এলেও মুখ ফিরিয়ে নেয়নি বাংলাদেশ। আন্তরিকতার চূড়ান্ত নজির রেখে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে প্রতিদিনই আশ্রয় দিচ্ছে জনবহুল বাংলাদেশ। তাদের সার্বিক সহযোগিতাও করছে সরকারসহ বিভিন্ন এনজিও সংস্থা। পাশে দাঁড়িয়েছে দেশের আপামর জনতা। যার যতটুকু সাধ্য, তা দিয়েই মৃত্যুর মুখ থেকে পালিয়ে আসা এসব অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

যে বিশ্বসংস্থা রোহিঙ্গাদের প্রবেশে বাংলাদেশকে আহ্বান জানানোসহ এদের পাশে দাঁড়াতে ধনী দেশগুলোকে অনুরোধ জানিয়েছিল, তারাই এখন বলছে আর কেউ এগিয়ে না এলেও এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। প্রতিদিনই অসংখ্য রোহিঙ্গা নাগরিক সেদেশে প্রবেশ করছে।

জাতিসংঘের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসি মঙ্গলবার জানায়, বাংলাদেশ সীমান্তে প্রতিনিয়তই রোহিঙ্গাদের ঢল বাড়ছে। তাদের হিসেবে, গত চব্বিশ ঘণ্টায় এই সম্প্রদায়ের ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

 

আর গত ২৫ আগস্ট থেকে মোটের উপরে ১ লাখ ২৩ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে ঠাঁই নিয়েছে। জনবহুল বাংলাদেশে এর আগেও ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। সব মিলিয়ে আশ্রয় দেয়া এত বিপুল সংখ্যক মানুষের ভরণপোষণ বাংলাদেশের পক্ষে কষ্টসাধ্য হলেও বাস্তবতাকে ছাড়িয়েছে ‘মানবিকতা’!

শান্তিতে নোবেল জয়ী গণতন্ত্রীপন্থী নেত্রী অং সান সুচি’র শাসিত মিয়ানমার যতটুকু অমানবিকতার প্রমাণ রাখছে, তার চাইতেও বেশি মানবিকতার প্রমাণ রাখছে বাংলাদেশ সরকার। অসহায় এসব মানুষকে রক্ষায় মিয়ানমার তো বটেই বিশ্ব মহলকে আহ্বান জানিয়ে কার্যত ফল না পেলেও তাদের আশ্রয়দানে থেমে নেই বাংলাদেশ।

এইচআরডব্লিউ’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এরই মধ্যে স্যাটেলাইট চিত্রের প্রমাণসহ জানিয়ে দিয়েছে, সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূলে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে মিয়ানমার। স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, রাখাইনে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত কোনো গ্রামই আর টিকে নেই। শত শত বছর ধরে বাস করা অনেক রোহিঙ্গা এখনও নিজ ভূখণ্ড ছাড়তে নারাজ। বনে বাদাড়ে পালিয়ে থাকলেও তাদের রেহাই মিলছে না। খুঁজে খুঁজে তাদের হত্যা করছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী।

এসব হত্যা আর নির্যাতনের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এখন বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের হাতে হাতে.. মুঠোফোনে! তাই সাধারণ মানুষ সে সব ভয়াবহ চিত্র দেখে রোহিঙ্গা নির্যাতনের নিন্দা ও প্রতিবাদও জানাচ্ছেন। কিন্তু টনক নড়ছে না কোনো রাষ্ট্রযন্ত্রের। প্রতিদিনই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষ রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে দমনের জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি ক্ষোভ ঝাড়লেও অং সান সুচি সরকারের প্রতি কার্যত কোনো দেশই চাপ প্রয়োগ করেনি।

ফলে গেল সোমবার জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার এক শীর্ষকর্তা বলেছেন, মিয়ানমারের কথিত শান্তিকামী নেত্রী অং সান সুচিকে দমন অভিযান থামাতে চাপ প্রয়োগ করার এখনই সময়! নচেৎ অনেক দেরি হয়ে যাবে। এই অঞ্চলের শান্তি বজায় রাখার জন্যও বিশ্ব মহলের অবিলম্বে এগিয়ে আসা উচিৎ।

জাতিসংঘ এটাও বলছে, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হলেও তা সঠিক নয়। আসলে মূল হিসেব এর চাইতেও বেশি। এমনকি মিয়ানমারের জুলাই থেকে শুরু হওয়া দমন অভিযানের কারণে ঠিক কতো মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে তাও পরিস্কার করে বলা মুশকিল! সংখ্যাটা স্বাভাবিকভাবেই অনেক অনেক বেশি।

সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, পালিয়ে আসা এসব মানুষের জন্য প্রয়োজন খাদ্য ও পানীয় এবং চিকিৎসা সুবিধা। এখনই সেসবের জোগান নিশ্চিত না হলে সংকট হঠাৎ করেই মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চল কক্সবাজারে কর্মরত জাতিসংঘের এক মুখপাত্র মঙ্গলবার জানিয়েছেন, তাদের যে দু’টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে তা বহু আগেই পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে পালিয়ে আসা নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা রাত কাটাচ্ছেন আশ্রয় কেন্দ্রের বাইরে খোলা আকাশের নিচে। সেখানেও অনেকের জায়গা না মেলায় তারা শয্যা নিয়েছেন সড়কের উপর।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.