প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিস্তারিত

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগে বহাল থাকার পর এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সরকারি দলের নেতারা ছাড়াও আইনমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সোমবার এক আলোচনাসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় ধরে ওই রায়, রায়ের সমালোচনায় আদালতে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য এবং বিচার বিভাগ সম্পর্কে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।

ষোড়শ সংশোধনী মামলায় প্রধান বিচারপতির ‘ব্যতিক্রমী’ পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর এরকম প্রতিক্রিয়াকে অনেকে নজীরবিহীন এবং সাহসী বলেছেন। তবে, রাষ্ট্রের দু’ বিভাগের মধ্যে এরকম বিতর্ককে শঙ্কার কথা জানিয়ে সমালোচনাও করছেন কেউ কেউ।

পক্ষ-বিপক্ষ যাই থাকুক, মানুষের আলোচনায় এখন প্রধানমন্ত্রীর ওই ‘ব্যতিক্রমী’ ভাষণ। এক নজরে আরেকবার দেখা নেয়া যাক কী বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা:

স্বাধীনতা ভালো, কিন্তু তা বালকের জন্য নয় বলে একটা কথা আছে। কাজেই ওই বালকসুলভ আচরণ আমরা আশা করি না। অনেক অবান্তর কথা এবং স্ববিরোধী বক্তব্য…।

পাকিস্তানের সাথে তুলনা করা… সব সহ্য করা যায়, কিন্তু পাকিস্তানের সাথে তুলনা করলে… এটা আমরা কিছুতেই সহ্য করব না। পাকিস্তান রায় দিলো দেখে কেউ ধমক দেবে… আমি জনগণের কাছে বিচার চাই। আমার বিচার আমি জনগণের কাছে চাই, আজকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সাথে কেন তুলনা করবে? আর, ওই হুমকি আমাকে দিয়ে লাভ নাই। যে পাকিস্তানকে বাংলাদেশ যুদ্ধ করে হারিয়েছে, যে পাকিস্তান ব্যর্থ রাষ্ট্র, সেই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করার বিচার জনগণের কাছে চাই। জনগণ সব থেকে শক্তিশালী। জনগণের আদালত সব থেকে বড় আদালত। জনগণের আদালতকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না।

কেউ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলে তার বিচার হবে। জনগণের আদালতের বিচারই বড় বিচার। সেটাও আমি চিন্তা করতে বলব।
ষোড়শ সংশোধনী… সেখানে আপিল বিভাগের প্রত্যেকটা জজ সাহেব… তারা কিন্তু স্বাধীন মতামত দেওয়ার কতটুকু সুযোগ পেয়েছেন- সেটা আমি জানি না। সে সুযোগটা মনে হয়, প্রধান বিচারপতি তাদের দেন নাই। রায় পড়লে সেটা কিছু বোঝা যায়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছে পার্লামেন্টের মেম্বার দ্বারা। সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন করেন। আর সেই রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন প্রধান বিচারপতিকে। ওই রাষ্ট্রপতি দ্বারা নির্বাচিত হয়ে, ওই চেয়ারে বসে নিজের নিয়োগের কথা ভুলে গেলেন?… এই কথাগুলো বলার আগে উনার ওই পদ থেকে সরে যাওয়া উচিত ছিল।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, উচ্চ আদালত থেকে নানা ধরনের বক্তব্য… রাজনৈতিক কথাবার্তা এবং হুমকি ধামকি…। আমার মাঝেমধ্যে অবাক লাগে, যাদেরকে আমরাই নিয়োগ দিয়েছি। মহামান্য রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়েছেন। এবং নিয়োগ পওয়ার পর হঠাৎ করে পার্লামেন্ট সম্পর্কে তাদের বক্তব্য শুনে… পার্লামেন্ট সদস্য যারা, তাদেরকে ক্রিমিনাল বলা হচ্ছে। সেখানে ব্যবসায়ী আছে; সেটাও বলা হচ্ছে। ব্যবসা করাটা কী অপরাধ? কোনো ব্যবসায়ী মামলা করলে উচ্চ আদালত কী তাদের পক্ষে রায় দেয় না? রায় তো দেয়। বিচার তো তারাও পায়। তারা যদি সংসদ সদস্য হয়, তাহলে অপরাধটা কোথায়? পার্লামেন্টকে হেয় করা, পার্লামেন্ট নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করা, এটার অর্থটা কী?

আমাদের প্রধান বিচারপতির রায়ে পার্লামেন্ট সম্পর্কে বক্তব্য, সংসদ সদস্যদের সম্পর্কে বক্তব্য, এমনকি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাও নিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা- এটা কোন ধরনের কথা? আমাদের সংবিধান আছে। সংবিধানের কোনো কোনো অনুচ্ছেদ, যেটা মূল সংবিধানে ছিল; সেটাও উনার পছন্দ না। পছন্দ কোনটা? ওই জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে মার্শাল ল’অর্ডিনেন্সের মাধ্যমে যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করেছে; সেটা উনার পছন্দ। আমাদের গণপরিষদ যে ধারা করে দিয়েছে; সেটাও উনার পছন্দ না। পুরো আদালতের দায়িত্ব সব উনার হাতে দিতে হবে। তিনি কী করবেন?

জয়নুল আবেদীন, তিনি জজ ছিলেন, একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হামলার যে তদন্তের রিপোর্ট তিনি দিয়েছেন- ভুয়া, মনগড়া তথ্য দিয়ে… বলতে গেলে বিএনপি সরকারের ফরমায়েশি তদন্ত রিপোর্ট তিনি দিয়ে গেছেন। তিনি যে দুর্নীতি করেছেন, সে দুর্নীতির তদন্ত দুদক যখন করতে গেছে, দুদকের পক্ষ থেকে কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছিল। এই প্রধান বিচারপতি চিঠি দিয়ে দিলেন; এই জয়নুল আবেদীনের দুর্নীতির তদন্ত করা যাবে না। তদন্তই করা যাবে না! প্রধান বিচারপতি হয়ে এই কথাটা উনি কীভাবে বলেন! একজন দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয় দেওয়া, দুর্নীতিবাজকে রক্ষা করা, এটা তো প্রধান বিচারপতির কাজ নয়। এটা তো সংবিধানকে অবহেলা করা, সংবিধানকে লঙ্ঘন করা। তার বিচার করা যাবে না কেন? তিনি অনেক রায় দিয়েছেন- সেই জন্য? রায় দিলেই তার বিচার করা যাবে না? এটা আবার কোন ধরণের কথা!

তার মানে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল হলে কোনো বিচার হবে না? কোর্টের যে স্যানিটি, সেই স্যানিটি যারা ধ্বংস করেছে, তাদের সবাইকে রক্ষা করার জন্যই কি তিনি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল চাচ্ছেন? রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাও হাতিয়ে নিয়ে যাওয়া… এটা কোন ধরনের দাবি। কারো জ্ঞানবুদ্ধি নাই, জ্ঞানবুদ্ধি ওই এক দু’জনের!

রাষ্ট্রপতির সে ক্ষমতাও কেড়ে নিতে চাচ্ছেন? যে ক্ষমতা সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে, সে ক্ষমতা কেড়ে নেন কীভাবে ? সেটা দেওয়া হচ্ছে না বলেই যত রাগ, আর গোস্বা, আর অ্যাটর্নি জেনারেলকে যা তা মন্তব্য করা হচ্ছে। কেন? পার্লামেন্টের মেম্বারদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করা, এটা তো উচ্চ আদালতের দায়িত্ব না।

সাংসদরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। তারা জনগণের কথা বলেন, তাদের জবাবদিহিতা জনগণের কাছে।

রায় পড়ে পড়ে যেখানে অস্বাভাবিক লাগছে নোট নিচ্ছি। পার্লামেন্টের আগামী অধিবেশনে আলোচনা করব।

সুত্রঃ চ্যানেল আই অনলাইন

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.