চিকিৎসায় প্রতারণা যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসকের চেয়ারে বহিরাগত

ইযানূর রহমান : যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে রোগিদের চিকিৎসাসেবায় ভয়াবহ প্রতারণা করা হচ্ছে। চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে চেম্বারে বসে রোগির ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন বহিরাগতরা। আসলে তারা কোন চিকিৎসক নয়। প্রাইভেট মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে তারা সরকারি এ হাসপাতালে বিনা বেতনে ৬ মাসের জন্য মাঠ প্রশিক্ষণে (ফিল্ড ট্রেনিং) এসেছেন। রোগিরা উন্নত চিকিৎসার আশায় এ হাসপাতালে এসে না জেনে বহিরাগতদের দেয়া ব্যবস্থাপত্র নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।

মঙ্গলবার হাসপাতালের বর্হি:বিভাগের ১২৩ নম্বর কক্ষে অর্থোপেডিক বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডাঃ আনম বজলুর রশীদ টুলুর অনুপস্থিতিতে তার কক্ষে রোগির চিকিৎসা দিচ্ছিলেন দয়াময় মন্ডল নামে এক বহিরাগত। তার প্রতারণা ফাঁস হওয়ার পর তিনি আতœগোপনে চলে যান। এর কয়েকদিন আগে ডেন্টাল ও চক্ষু বিভাগে বহিরাগতরা রোগির চিকিৎসা দেয়ার ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিলো।

যশোর সদর উপজেলার চান্দুটিয়া গ্রামের ইয়াকুব সরদারের স্ত্রী মোমেনা খাতুন পা পিছলে পড়ে অসুস্থ হলে মঙ্গলবার তাকে আনা হয় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে। এসময় জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক কল্লোল কুমার সাহা তাকে অর্থোপেডিক বিভাগে রেফার্ড করেন। স্বজনেরা তাকে নিয়ে যান বহিঃবিভাগের ১২৩ নম্বর কক্ষে। দরজার সামনে ডাঃ আনম বজলুর রশীদের নাম সম্বলিত সাইনবোর্ড টানানো থাকলেও ভিতরে রোগির চিকিৎসাসেবা দিচ্ছিলেন আরেকজন।

মোমেনা খাতুনের ছেলে শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ডাঃ বজলুর রশীদ টুলুকে চেনেন। তার কক্ষে আরেকজনকে দেখে তার সন্দেহ হয়। এ সময় তিনি বিষয়টি একজন সংবাদকর্মীকে জানান। ওই সংবাদকর্মীসহ কয়েকজন রোগির স্বজন সেখানে গিয়ে চিকিৎসক সেজে রোগির ব্যবস্থাপত্র দেয়া ব্যক্তির কাছে তার পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। তখন তিনি জানান তার নাম দয়াময় মন্ডল। তিনি চিকিৎসক নন। প্রাইভেট মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে ৬ মাসের ফিল্ড ট্রেনিংয়ে এ হাসপাতালে এসেছেন। তাহলে রোগিদের চিকিৎসা দিচ্ছেন কেনো জানতে চাওয়া হলে দয়াময় মন্ডল কক্ষ থেকে দ্রæত বের হয়ে নিজেকে আতœগোপন করেন।

অর্থোপেডিকের ডিউটি রোস্টারের তথ্যানুযায়ী গতকাল মঙ্গলবার বহিঃবিভাগে ১২২ নম্বর কক্ষে অর্থোপেডিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ গোলাম ফারুক ও ১২৩ নম্বর কক্ষে দায়িত্ব ছিলো মেডিকেল অফিসার ডাঃ আনম বজলুর রশীদ টুলুর। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে সহযোগী অধ্যাপকের চেয়ারে বসে রোগি দেখছেন মেডিকেল অফিসার। আর মেডিকেল অফিসার ডাঃ আনম বজলুর রশীদ টুলুর কক্ষে রোগির চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন বহিরাগত দয়াময় মন্ডল। কয়েকজন রোগির স্বজন জানিয়েছেন, ডাঃ বজলুর রশীদ টুলুর প্রশ্রয়ে তার কক্ষে বসে বহিরাগত দয়াময় মন্ডল চিকিৎসাসেবায় প্রতারণার সাহস পেয়েছেন। হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (নিট) যশোর শাখা থেকে প্যারামেডিক বিষয় শেষ করা ৬ জনকে ৬ মাসের মাঠ প্রশিক্ষণ করার সুযোগ চেয়ে গত ১১ জুন প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মেহেদি হাসান যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত¡াবধায়কের কাছে আবেদন করেন। ওই ৬ জন হলেন কাকলী মুস্তারী, খালেদা সুলতানা, বিকাশ দেবনাথ, কৃষ্ণ গোপাল, রবিউল ইসলাম ও দয়াময় মন্ডল।

গত ১ জুলাই তত্ত¡াববধায়ক ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনু তাদের প্রশিক্ষণের অনুমতি দেন। আর এ সুযোগে এসব বহিরাগতরা চিকিৎসক সেজে রোগিদের সাথে প্রতারণা করছেন। কয়েকদিন আগে বহিঃবিভাগের চক্ষু ও ডেন্টাল বিভাগে চিকিৎসকের পরিবর্তে বহিরাগতরা রোগির ব্যবস্থাপত্র দেয়ার ঘটনায় ভুক্তভোগিদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানালে ওইসব বহিরাগতদের ট্রেনিং অনুমোদন বাতিল করে হাসপাতাল থেকে বের করার হুমকি দেয়া হয়। তবুও তাদের প্রতারণা থেমে নেই। চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে তারা রোগিদের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্টের প্রতারণার ব্যাপারে ডাঃ বজলুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য না করে তত্ত¡াবধায়কের সাথে কথা বলতে বলেন।

সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ গোলাম ফারুক জানান,আমি বেলা পৌনে ১২টার দিকে চেম্বার থেকে বেরিয়ে মেডিকেল কলেজে গিয়েছিলাম। এ সময় ডাঃ বজলুর রশীদ টুলুকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট কোন ভাবেই রোগির চিকিৎসা দিতে পারবেন না। তার কাজ হলো চিকিৎসক সাক্ষরিত ছোটো কাগজে ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধের নাম লিখে দেবেন।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডাঃ ওয়াহিদুজ্জামান ডিটু জানান, মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট চিকিৎসক সেজে রোগির ব্যবস্থাপত্র দেয়া মানে প্রতারণা। তিনি অর্থোপেডিক বিভাগে খোঁজ নিয়ে দেখছেন। এর আগে চক্ষু ও ডেন্টাল বিভাগে এমন ঘটনায় তাদের কঠিনভাবে সতর্ক করা হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত¡াবধায়ক ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনু মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে জানান, কোন মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট রোগির ব্যবস্থাপত্র দিতে পারবেন না। তাদের কাজ হলো রোগীর চিকিৎসাসেবা প্রদানের সময় চিকিৎসককে সাহায্য করা। আমি কয়েকদিনের ছুটিতে আছি। যদি কোন মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট চিকিৎসক সেজে রোগির চিকিৎসা দেন তাহলে কর্মস্থলে ফিরে তার ট্রেনিং অনুমোদন বাতিল করে দেবো।

Comments are closed.