চকরিয়া-লামা সংযুক্তি ব্রীকফিল্ড সমূহে শত শত কোটি টাকার পোড়ানো হচ্ছে সরকারি বনাঞ্চলের কাঠ।

 

 

মোঃ নাজমুল সাঈদ সোহেল, চকরিয়া প্রতিনিধি

 

কক্সবাজারে চকরিয়ায় এক সময় প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর ছিল।নানা পরিবেশগত হুমকি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের কু প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকলেও চকরিয়ায় প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার যে অপার সম্ভাবনা এখনো আছে,জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাকে একরকম টেকসই পরিবেশ সংরক্ষণের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়।চকরিয়াতে অধিকাংশ ইটভাটার অবস্থান পাহড়ি বন থেকে খুব বেশী দূরে নয়।এর কারণ হলো পাহড়ি এলাকার মাটির গুনাগন ও জ্বালানী কাঠের সুপ্রাপ্যতা।পাহড়ি এলাকার মাটি ইট তৈরীর জন্য বেশ উপযুক্ত ও পাহাড়ের বৃক্ষ সম্পদ ইট ভাটার অবৈধ জ্বালানী কাঠের উৎস।ইট ভাটা থেকে যে ধোঁয়া নির্গত হয় তা এলাকার মানুষের স্বাস্থের জন্য হুমকি স্বরূপ। এছাড়াও ইট ভাটার ছাই স্থানীয় ফসলের উপর আস্তরণ তৈরী করে যা সালোকসংস্লেষণ বাধাগ্রস্থ করে এবং ফলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত করে।চকরিয়ার বনাঞ্চল যেন ইটভাটার জন্য সৃজন করা হয়েছে।ইটভাটার মালিকেরা এখানে প্রতি বছর সরকারী বনাঞ্চলের গাছ জ্বালানি হিসাবে ব্যবহারের জন্য আগাম কিনে নেয়!। মৌসুমের শুরুর আগেই ইটভাটার মালিকেরা লোক নিয়োগ করে বনাঞ্চল থেকে প্রকাশ্যে গাছ কেটে নিয়ে যায় ফাইতং ইটভাটার আশেপাশে। এভাবে প্রতি বছর চকরিয়া, লামার ফাঁসিয়াখালী ও ফাইতংয়ের ৩৫টি ইটভাটায় চকরিয়ারবনাঞ্চল থেকে প্রায় দুইশ’ কোটি টাকার কাঠ পুড়ছে। এ বছরও ওই একই পরিমানের কাঠ পুড়েছে এসব ইটভাটায়। এসব দেখার কেউ নেই, যারা আছে তারাই বরং বন ধ্বংসকারীদের সহযোগিতা দিচ্ছে। এতে ইটভাটার মালিক, প্রভাবশীলী ব্যক্তি, কতিপয় জনপ্রতিনিধি,পুলিশ, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তার প্রতিনিধি ও বনকর্মীরা লাভবান হলেও এতদাঞ্চলের বনাঞ্চল ন্যাড়া বনভূমিতে পরিনত হচ্ছে।এ প্রতিবেদক সরেজমিন বিচরনে প্রাপ্ত তথ্য মতে, চকরিয়ার হারবাংয়ে ৪টি, চকরিয়ার কুল ঘেঁষয়ে পাশের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ও ফাইতং মৌজার ৩০টি,চকরিয়ার ডুলহাজারা ইউনিয়নের অদূরে ৫টি সহ মোট ৪০টি ইটভাটা চকরিয়া ও লামার সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘেঁষে এবং ভেতরে গড়ে উঠেছে এসব ইটভাটা। ইটভাটগুলোতে সরকারী ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ম নীতিমতে কয়লা দিয়ে ইট পুড়ানোর কথা থাকলেও বাস্তবচিত্তে প্রধানত কাঠ পুড়ে ইট তৈরী করা হয়। লোভ দেখানো নামেমাত্র সামান্য কিছু কয়লা শো দিয়ে রাখা হয়, কয়লাতে ব্যায়ভার বেশী থাকায় এর আদলে মূলত অধিক মুনফায় ইট পুড়ানো হচ্ছে শত শত হেক্টরের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মূল্যবান কাঠ।এসব জ্বালানি কাঠগুলোর বেশীরভাগই চকরিয়া ও লামা বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। ইটভাটায় সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, ইটভাটার মালিকেরা ইট পুড়ানোর জন্য মৌসুম শুরুর আগেই জ্বালানি হিসাবে পাশের বনাঞ্চলের গাছ কিনে মজুদ করে রাখে । স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, কতিপয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও বনকর্মীদের যোগসাজস করে জ্বালানি হিসাবে সরকারী বনের গাছ বিক্রি করে দিয়ে থাকে। মৌসুমের সময় বা একটু আগেই ইটভাটার মালিকরা লোক দিয়ে বনাঞ্চলের গাছগুলো কেটে নিয়ে যায়। ফলে সরকারের কোষাগারে বঞ্চিত হচ্ছে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব।

স্থানীয় এলাকাবাসির সূত্রে জানা যায়, গাছ কেটে নেয়া বনের দৃশ্য দেখলে অবাক হওয়া তো দূরের কথা, যে কেউ হতবাক হয়ে যাওয়ার মত নিয়মিত ব্যাপার মাত্র। ইটভাটার মালিকরা বনাঞ্চলের গাছের পাশাপাশি ঝুপজঙ্গল, লতাগুল্মসহ বিশেষ করে সরকারী বনায়ন প্রকল্পের গাছ পুরোদমে কেটে নিয়ে যায়। একটু দৃষ্ট দিলে প্রতিনিয়ত দেখা মেলে বানিয়ারছড়া-ফাইতং সড়ক দিয়ে যে সব ব্রীক ফিল্ডের কাঠ যাচ্ছে সে সব ব্রীক ফিল্ড গুলোর মধ্যে রয়েছে ফখরুদ্দীনের মালিকানাধীন ঝইগ, নাজেম উদ্দিনের ঋইগ,মহিউদ্দিনেরগইগ, নাজু (চুনতি) অগই, দুবাই প্রবাসী রফিক আহমদের অইগ, মো.বেলাল উদ্দিনের অইঈ২ এবং অইঈ৩মাহমুদুল হকের গইও, ফেরদৌস আহমদের ইইঈ, হুমায়ুন কবির ঐইগ,জামায়াত নেতা আরিফুর রহমান মানিক চইঈ,আমির হামজা ঞঝই, পেকুয়া ভাইস চেয়ারম্যান মন্জু চইগ, মোজাম্মেল হকের ঊইগ, বিএনপি নেতা মোক্তার আহমদের ইইগ, কবির আহমদের টইগ১ ও ২বশির আহমদেরঝঅই, মোক্তার আহমদ ৩ইগ, গিয়াস উদ্দিনের গগই, জসিম উদ্দিনের ঝইড, বিএনপি নেতা ফরিদুল আলমের ঋঅঈ ও ঐগই হাকীম মজিদ ব্রিক্স ম্যানুফেকচারিং,বাবুল চৌধুরীর অগজ ব্রীক ফিল্ডসহ ২৪টির মতো ফিল্ডে জ্বালানী হিসেবে বনের কাঠ ব্যবহার করেছে বলে স্থানীয় জনসাধারনে অভিযোগের প্রেক্ষিতে জানা যায়। প্রায় ৪০টির মতো ফিল্ডের জ্বালানী কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফিল্ডের এক কর্মরত শ্রমিকের ভাষ্যমতে জানা যায়; প্রত্যেক ইটভাটায় প্রতি মৌসুমে জ্বালানি হিসাবে ৫০থেকে ৫৫ হাজার মন লাকড়ী বা জ্বালানী কাঠ আবশ্যক। সেই হিসাবমতে চকরিয়া ও লামার ফাইতংয়ে ৪০টি ইটভাটায় প্রতি বছর ২০ লক্ষ মন থেকে ২২ লক্ষক মন লাকড়ীর নিয়মিত প্রয়োজন। প্রতি মন লাকড়ীর স্থানীয় মূল্য ১৬০ টাকা থেকে ২শত টাকা পর্যন্ত। এভাবে ওই ৪০ টি ইটভাটায় প্রতি বছর প্রায় ৪৪০;০০০;০০০ কোটি টাকার উপরে কাঠ পুড়ছে।

স্থানীয় এলাকাবাসি জানায়, চকরিয়ার বিএনপি নেতা ফরিদ কন্ট্রাক্টারের ভাই জালাল উদ্দিন লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগ নেতা!। সেই সুযোগে প্রভাব খাটিয়ে তিনি বনের গাছ কেটে ইটভাটায় নিয়ে গেলেও কেউ বাধা দিতে সাহস করে না। চকরিয়া ও লামার ফাইতংয়ের বেশীরভাগ ইটভাটার মালিক বিএনপি জামাত সমর্থিত হলেও তারা স্থানীয় আওয়ামীলীগ নাম ধারী কিছু ব্যক্তির ছত্র ছায়ায় থাকায় পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ডে যুক্ত হয়েও পার পেয়ে যাচ্ছে। চকরিয়ার সামাজিক বনায়নের বেশীরভাগ গাছ জোর করে কেটে ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সামাজিক বনায়নের উপকারভোগীরা অভিযোগ করার পরও গাছ লুটেরাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হচ্ছে না।

চকরিয়ার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের সামাজিক বনায়নের সাঃ সম্পাদক মুবিনুল হক জানান; কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের নলবিলা বিটের অধীনের কাকারা মৌজার এলাকায় কয়েশত একর সরকারী বনভূমি রয়েছে। ওই বন ভূমি সরকারী ব্যাবস্থাপনায় প্লট আকারে বনায়নের বরাদ্দ দেওয়া হয় জনগনদের।সরকারী পৃষ্টপোষকতায় বরাদ্দকৃতদের নিয়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ার মাধ

মাধ্যমে গাছের ঘনঘাটায় হাঁটা মুসকিল হয়ে পড়েছিলি। আর সেই বনাঞ্চলের দিকে তাকালে বুঝা যাই বনাঞ্চল তো দূরের কথা পাহাড়ী মাটি ছাড়া আর কিছুই অবলোকন করা যাই না। গত কিছুদিন আগে বন বিভাগের টেন্ডারের মাধ্যমে যষসামান্য নামে মাত্র সরকারী কোষাগারে টাকা জমা হয়।ফলে সরকারী কোষাগারে হারাচ্ছে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব। গাছগুলো প্রতিনিয়ত উজাড় হয়ে ফাইতংয়ের ইটভাটাসহ বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করে দিয়েছেন বন বিভাগের নলবিলা বিটে থাকা অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশের মাধ্যমে। একই এলাকার মোহাম্মদ আমান উল্লাহ নামে আরো এক ব্যক্তি এ বছর ৫০লাখ থেকে ৬০লাখ টাকার বনাঞ্চলের কাঠ বিক্রি করেছে। এসব কাঠগুলো লামার ফাইতংয়ের ইটভাটার মালিকেরা বন থেকে কেটে নিয়ে যাই। বলতে গেলে এককথায় এসব বনভূমি এখন ন্যাড়া হয়ে বদ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে।

সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়; কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের নলবিলা বিট, রিংভং (ফাঁসিয়াখালী) বিট, ডুলাহাজরা বিট, মানিকপুর বিট, কাকারা বিট ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের চুনতি রেঞ্জের বরতইতলী, হারবাং বিটের বেশীর বনাঞ্চল উজাড় হয়ে গেছে। এসব এলাকায় সামাজিক বনায়নের গাছও রক্ষা করা যাচ্ছে না। সামাজিক বনায়নের গাছও জোর করে কেটে ইটভাটায় নিয়ে গেছে বলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুল মতিন বলেন; বনের গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি তদন্ত করে সত্যতা পেয়েছেন। নলবিলা বিট অফিসের এক কর্মকর্তা জানান; তার বিটের খেদারবান এলাকার গাছগুলো ফাইতংয়ের ইটভাটায় নিয়ে যাওয়ার জন্য কাকারার পাহাড়ী এলাকায় একটি রুট তৈরী করেছে। ওই রুট দিয়েই গাছগুলো ফাইতংয়ের ইটভাটার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি বন ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছেন বলে জানান।

এ বিষয়ে উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের কোন বিহিত ব্যাবস্থাদি গ্রহণে উদ্যোগী না নিলে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবেশ ভারসাম্য হুমকি স্বরূপ। তাই অনতিবিলম্বে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে জোর দাবী জানিয়েছেন এলাকার পরিবেশবাদীগন সহ সচেতন জনসমাজ।

Comments are closed.