কাপ্তাইয়ে পাহাড় ধস ট্রাজেডির ৪ বছর আজ

কাপ্তাই প্রতিনিধি:
আজ ভয়াবহ ১৩ জুন। ২০১৭ সালের এই দিনটি ছিল রাঙ্গামাটির কাপ্তাইবাসীর জন্য এক বিভীষিকাময় দিন। এরআগের দিন (১২ জুন-২০১৭) মধ্যরাত হতে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। টানা বর্ষনে ঘরবন্দি উপজেলার অধিকাংশ মানুষ। অতিবৃষ্টিতে সেদিন কাপ্তাইয়ের সকল সড়ক পথ যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। অজানা আশংকা ভর করেছিল জনমনে।
১৩ জুন সকালে কাপ্তাইবাসী শুনলো ভয়াবহ পাহাড় ধসের কথা। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে লাগলো মৃত্যুর খবর। ওইদিন সকালে প্রথম দূসংবাদটি আসে চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের মিতিঙ্গাছড়ি থেকে। ভয়াবহ পাহাড় ধসে সেদিন ওই এলাকায় বসবাসরত নুরনবী ও তার ছেলের গর্ভবতী স্ত্রী এবং তার শিশু পুত্র ঘটনাস্থলে পাহাড় ধসে মৃত্যুবরণ করে। ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসসহ ওই এলাকায় ছুটে যান তদানীন্তন কাপ্তাই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তারিকুল আলম এবং চন্দ্রঘোনা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চৌধুরী বেবী। এরপর একে একে ওয়াগ্গার মুরালীপাড়া, রাইখালির কারিগর পাড়া এবং চিৎমরম হতে পাহাড়ধস আর মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। সেদিনের পাহাড় ধসে কাপ্তাই উপজেলায় প্রান হারায় মোট ১৮ জন। পাহাড়ী ঢ়লে তলিয়ে যায় শত শত একর ফসলী ক্ষেত, বিনষ্ট হয় বহু ঘরবাড়ী। এখনও সেদিনের কথা মনে করে শিহরিত হয়ে উঠে কাপ্তাইবাসী।
আজ ১৩ জুন,২০২১ কাপ্তাইয়ের পাহাড় ধসের ৪ বছর হলো। এখনো কাপ্তাইয়ের অনেক জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে বসবাস করছে শত শত পরিবার। বিশেষ করে কাপ্তাই ইউনিয়নের ঢাকাইয়া কলোনিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে বসবাস করছে কয়েকশ’ পরিবার। এছাড়া ওয়াগ্গা ইউনিয়নের মুরালীপাড়া, রাইখালী ইউনিয়নের কারিগর পাড়া, তিনছড়ি, চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের মিতিঙ্গাছড়িসহ দূর্গম অনেক জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে বসবাস করছে আরো অনেক পরিবার। বর্ষা মৌসুমে টানাবৃষ্টি হলে এদেরকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয় কেন্দ্র নিয়ে আসা হলেও এসব পরিবার গুলোকে স্থায়ীভাবে পূর্নবাসন করা যায়নি।
এবিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুনতাসির জাহান বলেন, উপজেলা প্রশাসন সবসময় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের সর্তক করে আসছে। অতিবৃষ্টি হলে এসব পরিবার গুলোকে নিকটস্থ স্কুলে আশ্রয় কেন্দ্রে যাবার জন্য অনুরোধ করছি, যাতে প্রানহানী না ঘটে। তিনি জানান, ইতিমধ্যে তারা কাপ্তাই এবং ওয়াগ্গা ইউনিয়নে প্রচার প্রচারনা চালিয়েছেন যাতে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে। কাপ্তাই ইউপি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আব্দুল লতিফ জানান, প্রতিবছর বর্ষা আসলে তারা অজানা আতংকে থাকেন, বিশেষ করে এই ইউনিয়নের ঢাকাইয়া কলোনিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে শতশত পরিবার বসবাস করছে। তিনি জানান, অতিবৃষ্টি হলে তারা পরিবার গুলোকে আশ্রয় কেন্দ্র ঘোষিত কাপ্তাই উচ্চ বিদ্যালয়ে এনে রাখা এবং তাদের খাবার পরিবেশন করা হয়ে থাকে। কিন্ত এটা কোন স্থায়ী সমাধান নয়, তিনি পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের স্থায়ীভাবে কোন নিরাপদ জায়গায় পূর্নবাসন করার জন্য সরকারের নিকট জোর দাবী জানান।
নৌ স্কাউটসের জেলা স্কাউট লিডার এম জাহাঙ্গীর আলম জানান, ২০১৭ সালের ১২ জুন দুপুরে কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়কের শীলছড়ি এলাকায় পাহাড় ধসে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে সে সময় সড়কের উভয় পাশে শতশত যান আটকে পড়ে। তখন তারা নৌ-স্কাউটসের ৪০ জন সদস্য নিয়ে সড়ক চলাচল উপযোগী করেন। এছাড়া পাহাড় ধসে নিহতের লাশ উদ্ধারে সহায়তা করেন।
প্রতিবছর বর্ষা মোসুমে অতিবৃষ্টি হলে কাপ্তাইয়ে অনেক জায়গায় পাহাড়ধসে প্রানহানীসহ সম্পদের ক্ষতি সাধিত হয়। ঘটনার পর ছুটে আসে মন্ত্রী, এমপি, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা। সকলেই আশ্বাস দেয় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের পূর্নবাসনের। কিন্ত বর্ষা শেষ হলেই সেসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে আর কেউ মাথা ঘামায় না, তাই কাপ্তাইয়ের সর্বস্তরের জনগনের দাবী, এসব পরিবার গুলোকে স্থায়ীভাবে পূর্নবাসন করা হউক, যেন আর কারোও মায়ের বুক খালি না হয়।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.