কঠোর লকডাউনের বিকল্প নেই!

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান মিয়া

নভেল করোনাভাইরাসের মহামারী থেকে বাচাঁর শেষ উপায় হিসেবে গতবছর বিশ্বের বিভিন্ন করোনাক্রান্ত দেশে লকডাউন দেয়া শুরু হয়েছিল। সর্বপ্রথম (২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারিতে) চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর লকডাউন করা হয়েছিল কারন উহান শহর থেকেই প্রথম করোনাভাইরাস মহামারির রূপ নেয় এবং যা পরবর্তীতে বিশ্বের প্রায় সকল দেশে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে করোনা সংক্রমনের তীব্রতা বেড়ে গেলে বিভিন্ন দেশে লকডাউন দেয়া শুরু হয়।

একই ভাবে ২০২০ সালের মার্চের শেষের দিকে প্রথম বারের মতো লকডাউনের কবলে পরেছিল বাংলাদেশ। সে সময়ে মানুষকে বাধ্যতামূলক ঘরে রাখার জন্য সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল। অকারণে বাইরে বের হওয়া ছিল সম্পূর্ণ নিষেধ। গণপরিবহন, দূরপাল্লার বাস মোটেও চলাচল করেনি। শপিংমল, রেস্তোরা ছিল পরোপুরি বন্ধ। পাড়া মহল্লায় অলি গলিতে ছিল বাশেঁর বেড়া যাতে অবাধে মানুষ চলাফেরা করতে না পারে। লকডাউন পালনে প্রশাসন ছিল খুবই কঠোর। অর্থ্যাৎ লকডাউন মানে লকডাউন।

এভাবে দীর্ঘদিনের লকডাউনে গোটাদেশ কার্যত অচল হয়ে পরেছিল। জনপদ ছিল একবারে নিস্তব্ধ। সামগ্রিক পরিস্থিতি মানুষকে বাধ্য করেছিল ঘরে অবস্থান করতে। তখনকার কঠোর লকডাউনে করোনা পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। তবে দীর্ঘদিন লকডাউনের ফলে চাকরীজীবীরা ঘরে শুয়ে বসে থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে পরেছিল। ছোট ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মূখীন হয়েছিল। খেটে খাওয়ারা পথে বসে গিয়েছিল। মানুষ জীবন ও জীবিকার মুখোমুখি দাড়িয়েছিল। মৃত্যুকে উপেক্ষা করে ক্ষুধা মেটানোর তাগিদ খেটে খাওয়া মানুষকে পাগল করে তুলেছিল। পেটের প্রয়োজনে অনেককেই পেশা পরিবর্তন করতে হয়েছিল। মোটকথা, লকডাউন আমাদের জন্য খুব একটা সুখকর ছিলনা।

বছর ঘুরে ২০২১ এ এসে আবার সেই লকডাউন। ৫ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত, ৭ দিনের জন্য। করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য এই লকডাউন দেয়া হয়েছে। তবে এখনকার লকডাউনের চিত্র গতবছরের লকডাউন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেউ কিচ্ছু মানছে না। রাস্তাঘাটে মানুষ ও গাড়ীর ব্যাপক সমাগম। সামাজিক দূরত্ব মোটেও মানা হচ্ছে না। মাস্ক পড়ায় রয়েছে অনীহা। মানুষ করোনাকে এখন আগেরমতো আর ভয় পাচ্ছে না বরং লকডাউনের বিরুদ্ধে ভাঙচুর করছে, করছে আন্দোলন।

লকডাউনের প্রতি মানুষের অনীচ্ছার কারনে প্রশাসনও ঢিলেঢালা ভাব দেখাচ্ছে। আসলে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ আবার কিছু প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে কোনোদিন লকডাউন হয় না। এভাবে সার্বিক অব্যবস্থাপনার কারণে লকডাউন এখন অর্ধলকডাউনে পরিণত হয়েছে যা উপকারের চেয়ে ক্ষতি করছে বেশী। আসলে বাংলাদেশে এসে লকডাউনের সংজ্ঞা পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখানে লকডাউন দুই ধরনের, সাধারণ লকডাউন ও কঠোর লকডাউন!

তাই ১৪ এপ্রিল থেকে ২য় দফায় কঠোর লকডাউনে দেশ। ১ম দফার সাধারণ লকডাউন কার্যত ব্যর্থ হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। যদিও কঠোর লকডাউনের বিপক্ষে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। এক শ্রেণির মানুষ মনে করে কঠোর লকডাউনে অর্থনৈতিক দূরবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় জীবন-জীবিকা দূর্বিষহ হয়ে পরে।

সাধারণ মানুষ করোনার চেয়ে পেটের ক্ষুধাকে বড় মনে করে। রুটি রুজির ব্যবস্থা বন্ধ থাকুক তা চায় না। তারা লকডাউনের বিকল্প কিছু একটা চায়। অবশ্য ২-৩টি দেশ (তাইওয়ান, দ. কোরিয়া) লকডাউন ছাড়াই করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উতরে গেছে। তাই কিছু বিশেষজ্ঞ মত দিচ্ছেন, লকডাউন না দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানাসহ কিছু বিশেষ বিধিনিষেধের উপর গুরুত্বারোপ করা যায় কিনা? যেমনঃ স্বাস্থ্যবিধি হিসেবে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা, নিয়মিত মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ইত্যাদি, জনসমাগম (সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান) বন্ধ করা, শপিংমল/দোকান ও ব্যাংক খোলার সময় সীমিত করা, করোনাক্রান্ত বা তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিবর্গকে চিহ্নিত করে কোয়ারেন্টাইন/আইসোলেশনে রাখার ব্যাবস্থা করা, মানুষের চলাফেরা/মুভমেন্ট নজরধারী রাখা বা সীমিত করা ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ কি এতসব বিধিনিষেধ মানতে প্রস্তত? আমরা কতটুকু স্বাস্থ্য সচেতন?

আমরা সুযোগ পেলেই ভিড় জমাই টুরিস্ট প্লেসে, শপিংমল বা রেস্তোরাতে তো আমাদেরকে যেতেই হবে, একদিন বাজারে না গেলে বা চায়ের দোকানে না বসলে আমাদের ভালো লাগে না, সামজিক দুরত্ব/ কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশন বিষয়গুলিকে আমরা থোরাই কেয়ার করি, ধর্মীয়/সামাজিক/ রাজনৈতিক গেদারিং আমাদের রক্তেমাংসে মিশে গেছে, মাস্ক পরলে আমাদের অসস্তি লাগে।

আমরা আমাদের দীর্ঘদিনের অভ্যাসগুলো কি রাতারাতি ভুলে যেতে পারবো? আমরা কি এতটাই সভ্য-ভদ্র হয়ে গেছি যে সব নিয়মনীতি মেনে চলব? আমাদের বিবেক কি এতটাই জাগ্রত? গেলো দু,সপ্তাহ ধরে দেশে করোনাক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে হু হু করে। হাসপাতালে কোনো সিট ফাঁকা নেই। আইসিইউগুলোতে মুমুর্ষবস্থায় পরে আছে অনেক করোনা রোগী। ঘরে ঘরে অসংখ্য করোনাক্রান্ত মানুষ। স্বজনদের দুশ্চিন্তা ও আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা এখোনা জন্মদিন/বিয়ের অনুষ্ঠান করি, শপিংমল বা রেস্তোরায় ভীর করি।

ভাবনাটা এমন যে, করোনাতে তোমার কিছু হবে না বা আমার তো করোনা হয়ে গেছে তাই আমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারবো। কি বৈচিত্র আমাদের চিন্তাচেতনায়, কর্মকাণ্ডে। মহামারী করোনায় একদিকে মানুষ দিন কাটাচ্ছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় আর অন্যদিকে কেউ কেউ আনন্দফুর্তি করে বেড়াচ্ছে। তাই কঠোর লকডাউনের বিকল্প চিন্তা করতে গেলে এরকম অনেক বিষয়ই আমাদেরকে মাথায় রাখতে হবে। তাছাড়া সকল করোনা রোগীর চিকিৎসা সেবাপ্রদানে আমাদের সীমাবদ্ধতাতো রয়েছেই।

এসব বিষয় চিন্তাকরেই অনেকে মনে করেন করেনার ঊর্ধ্বমূখী সংক্রমণ রোধে কঠোর লকডাউনের কোনো বিকল্প নেই। আবার করোনা মোকাবিলায় লকডাউনকেই সেরা উপায় বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তবে দীর্ঘকালীন লকডাউন সকলের জন্যই ক্ষতিকর হওয়ায় তা পরিহার করতে হবে। তাছাড়া ছোট ব্যবসায়ী ও খেটে খাওয়া মানুষের কথা অবশ্যই আমাদেরেকে বিবেচনায় আনতে হবে। বর্তমানে দেশে করোনার সংক্রমণ যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশী।

পরিস্থিতি এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভয়ানক মাসুল দেয়া লাগতে পারে। ইতিমধ্যে সাত দিনের অর্ধ্বলকডাউন আমাদের কোনো উপকারে আসেনি। তাই সামগ্রিক বিবেচনায় বর্তমানে আমাদের জন্য কঠোর লকডাউনের বিকল্প খুব একটা নেই বললেই চলে। জীবন বাচাঁতে হয়তো আমাদের আরেকবার যুদ্ধ করতে হবে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.