বাবার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ আজ বিশ্ব বাবা দিবস। ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববারকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করেন।

ইংরেজি হিসাব মোতাবেক এ বছর হিজরি সনের ২২ রমজান পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাবা দিবস। বাবা দিবস এলেই প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেই বিখ্যাত হাদিসের কথা মনে পড়ে যায়। হাদিসটি হলো-

‘যে ব্যক্তি তার বাবা-মাকে পেল কিন্তু তাদের সন্তুষ্ট করতে পারল না, তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত।’ আবার যেহেতু এবারের বাবা দিবসটি রমজান মাসে পড়েছে।

হাদিসের আরেকটি কথা মনে পড়ে যায়, তা হলো- ‘যারা রমজান মাস পেল কিন্তু নিজেদের গোনাহমুক্ত করতে পারল না তারও ধ্বংসপ্রাপ্ত।’

পৃথিবীতে বাবা এবং মা সন্তানের জন্য জান্নাত এবং জাহান্নাম। যারা বাবা-মাকে সন্তুষ্ট করতে পারল তাদের জন্য দুনিয়াই জান্নাত। আর যারা বাবা-মার সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যর্থ দুনিয়াই তাদের জাহান্নাম।

বাবা-মার খেদমত যেহেতু ইবাদত। আর তা যদি রমজান মাসে যথাযথ পালন করা যায় তবে তা হবে ‘এক ঢিলে দুই পাখি শিকার’-এর মতো। একটি হলো বাবা-মার খেদমত আর তা আবার বরকতময় রমজানে।

এ রমজানে বাবা-মার খেদমত করে তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলে রোজা ও বাবা-মার হক উভয়টি আদায় করা সম্ভব।

বাবার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলামের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কুরআন-হাদিসের দৃষ্টিতে বাবা-মায়ের মর্যাদা সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো-

বাবা পরিবারের চালিকাশক্তির প্রধান। বাবা সন্তানের জন্য শ্রেষ্ঠ বন্ধুও উত্তম পথপ্রদর্শক। বাবা-মা-ই সন্তানকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। এ পরম সত্য কথা। পৃথিবীতে সন্তানের সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তার কথা শুধুমাত্র বাবা-মা-ই ভেবে থাকেন। এজন্যই পৃথিবীর সব ধর্মেই বাবা-মাকে সর্বাধিক সম্মান দান করেছেন।

আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমের ১৫ জায়গায় বাবা-মার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

‘তোমার পালন কর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত কর না এবং বাবা-মার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন; তবে তাঁদের ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না এবং তাদের সঙ্গে বল শিষ্টাচারপূর্ণ কথা। (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ২৩)

বাবা-মা’র মর্যাদা সম্পর্কে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনেক হাদিস রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘বাবার সন্তুষ্টিতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন; আবার বাবার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন।’ সে কারণেই ইসলাম বাবা-মার সঙ্গে অন্যায় আচরণ করাকে বড় গোনাহের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

বাবা-মার মর্যাদা কত বড় তার প্রমাণে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের রয়েছে অনেক বড় একটি হাদিস রয়েছে। হাদিসটি সংক্ষিপ্ত রূপ হলো-

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, ‘একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বরের প্রথম ধাপে ওঠে বললেন, আমিন; দ্বিতীয় ধাপে ওঠে বললেন, আমিন; তৃতীয় ধাপে ওঠে বললেন, আমিন।’

সাহাবায়ে কেরাম বিশ্বনবির আমিন বলার কারণ জানতে চাইলেন-

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘এ মাত্র জিবরিল আলাইহিস সালাম আমাকে জানালেন যে ব্যক্তি রমজান পেলে কিন্তু তার গোনাহ মাফ হয়নি, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক; আমি বললাম আমিন।’

তারপর জিবরিল আলাইহিস সালাম বলল, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যার সামনে আমার নাম (মুহাম্মাদ) উচ্চারণ করা হলো কিন্তু সে দরূদ পড়ল না; তখন আমি বললাম আমিন। অতঃপর জিবরিল আলাইহিস সালাম বলল, ‘ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে বাবা-মা উভয়কে পেল অথবা একজনকে পেল কিন্তু তারা তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করালো না। আমি বললাম আমিন।’

হাদিসটির ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ বললেন, ‘বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতা দুর্বল হয়ে পড়ে; রোগে-শোকে অসহায় হয়ে পড়ে, সে অবস্থায় যে সন্তান বাবা-মা’র খেদমত তথা সেবা-যত্ন না করে তাদের জন্য এ ধ্বংস। যে ব্যাপারে বিশ্বনবি আমিন বলেছেন।

অথচ বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন উম্মতের জন্য দয়া ও মমতার মূর্ত প্রতীক। সব সময় উম্মতের জন্য আল্লাহর নিকট কল্যাণের দোয়া করতেন। অথচ পিতা-মাতার অবমূল্যয়ন করায় বিশ্বনবির তাদের ধ্বংসের ব্যাপারে আমিন বলেছেন।(নাউজুবিল্লাহ)

পরিশেষে…
বাবা দিবসের সন্তানের জন্য বাবা-মার প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন হোক মুসলিম উম্মাহর অঙ্গীকার। বাবা দিবসে তাদের উভয়ের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনে বিশ্বনবির ছোট্ট একটি হাদিস উল্লেখ করতে চাই-

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যখন কোনো সন্তান বাবা-মার প্রতি অনুগ্রহের দৃষ্টিতে তাকান; আল্লাহ তাআলা তার প্রতিটি দৃষ্টি বিনিময়ে সন্তানের আমলনামায় একটি কবুল হজের সাওয়াব লিপিবদ্ধ করেন।

এমনকি সাহাবায়েকেরামের প্রশ্নের উত্তরে বিশ্বনবি বলেন, কেউ যদি একশত বার তাকায়, তার বিনিময়ে একশত কবুল হজের সাওয়াব তার আমলনামায় যোগ হবে। (সুবহানাল্লাহ)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে এ রমজান মাসে বাবা-মায়ের খেদমত করার পাশাপাশি তাঁদের প্রতি অনুগ্রহের দৃষ্টি তাকিয়ে কবুল হজের সাওয়াব লাভের তাওফিক দান করুন। এবং মৃত বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Comments are closed.