পরের তরে নিবেদিত প্রাণ একজন শের আলী

বিশেষ প্রতিবেদক, কক্সবাজার।

“প্রতিদিন কতো খবর আসে যে কাগজের পাতা ভরে, জীবন পাতার অনেক খবর রয়ে যায় অগোচরে।” পুলিশ সদস্যদের হাজারও নেতিবাচক খবর শোনা যায় প্রতিদিন। সেসব খবর পড়তে পড়তে ভুলেই যাই যে, পুলিশও মানুষ। পুলিশের কোন সদস্যের মাঝে মানবতার চিহ্ণ খুঁজে পেলে আমরা গন্ধ শুঁকতে চাই; ভাবি এর পেছনে কোন উদ্দেশ্য নাই তো ! শের আলীর মতো মানুষগুলো পুলিশের প্রতি আমাদের আস্থা ফিরিয়ে আনে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)র গোয়েন্দা শাখার কনস্টেবল এই শের আলী। পাষাণ এই পৃথিবীতে কেউই জানতে চায়না প্রাণের আকুতি বারে বারে কী চায়। স্বার্থের টানে প্রিয়জনের দূরে সরে যাওয়াটাও যেন অমোঘ নিয়তি। কিন্তু শের আলীর মতো কিছু মানুষ অন্যের জন্য কাঁদেন, আর কাঁদান সবাইকে। এটা কোন সিনেমার কাহিনী নয় পুলিশের কনস্টেবল শের আলীর বাচ্চব জীবনে গল্প :

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল ছবিটা। বাস দুর্ঘটনায় আহত এক শিশুকে কোলে নিয়ে ছুটছেন একজন। শিশুটিকে বাঁচানোর আকুতিতে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তিনি। শের আলী তার নাম। পুলিশ কনস্টেবল। মানবিকতার অনন্য এক নজির স্থাপন করেছিলেন তিনি। সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য পুলিশ সপ্তাহ ২০১৭-এ রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম-সাহসিকতা) তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পুলিশ কনস্টেবল শের আলী (নম্বর ২৫৪৬) চট্টগ্রাম নগর পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিটের উত্তর-দক্ষিণ বিভাগের বোমা নিষ্‌ক্িরয়করণ ইউনিটে কমর্রত আছেন। কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার রশিদনগর ইউনিয়নের পানিরছড়া গ্রামে তার বাড়ি। দাম্পত্য জীবনে শের আলী এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। ১৯৯৮ সালে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন তিনি। ২০০৮-২০০৯ সালে দায়িত্ব পালন করেছেন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে। সেখানে মূলত একজন নার্স হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। তখন থেকে মানুষের সেবাকে ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছেন।

২০১৬ সালের ১১ ডিসেম্বর দুপুরে ছুটি নিয়ে কক্সবাজারের রামুর রশিদনগরের গ্রামের বাড়িতে যান কনস্টেবল শের আলী। বেলা সোয়া একটার দিকে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে খাবার খাচ্ছিলেন তিনি। এ সময় শুনতে পান, দেড় কিলোমিটার দূরে বাস দুর্ঘটনা ঘটেছে। শুনেই খাওয়া ফেলে সেখানে ছুটে যান। শের আলী বলেন, যাওয়ার পর দেখি এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। এরপর শাবল-খুন্তি যার কাছে যা ছিল তা দিয়ে গাড়িটির বিভিন্ন অংশ কেটে যাকে যেভাবে পেরেছি বের করেছি। দুটি লোককে ধরতে পারছিলাম না, টেনেও আনতে পারছিলাম না। আর একটা লোক আর্তনাদ করছিল। তবুও বাসের বডি কেটে কয়েকজনকে বের করে আনতে পেরেছিলাম। এরপর সেনাবাহিনীর রেকার দিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটি উপরে উঠানো হয়। গাড়িটি একটু ওপরে ওঠানোর পর ভিতরে প্রবেশ করে দেখি একজন মহিলার নিথর দেহ পড়ে আছে। তার পাশেই একটি রেকের নিচে চাপা পড়েছিল উম্মে হাবিবা কুলসুম নামের ৬ বছরের একটি কন্যাশিশু। সেদিনের কথা বলতে গিয়ে এখনো চোখ ভিজে উঠে তার। শের আলী বলেন, “তখন তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে কোনোমতে বাইরে বেরিয়ে আসি। রাচ্চায় সূযের্র আলোতে আসার পর মেয়েটির জ্ঞান ফিরে আসে। মেয়েটি বলল আব্বু পানি খাব। তার বয়সী আমার নিজের একটা মেয়ে আছে, তার কথা মনে পড়ে গেল। তখন আমার আবেগ এসে গেল, আমি নিজের অজান্তে কেঁদে কেঁদে মেয়েটিকে নিয়ে দৌড়ালাম যেদিকে অ্যাম্বুলেন্স আছে সেদিকে। তখন যে আমি কেঁদেছিলাম তাও আমার মনে নেই।” উম্মে হাবিবা কুলসুম এখন সুস্থ। এখন সে কক্সবাজারের আনাস বিন মালেক নূরানী মাদ্রাসায় শিশু শ্রেণীতে পড়ে। শের আলী প্রতিনিয়ত তার খোঁজ-খবর রাখে।

এখানেই শেষ হতে পারত শের আলীর মানবতার গল্প; যদি সেটা কিছু প্রাপ্তির আশায় হতো। তা যখন নয়, শের আলীর মানবতার গল্পও তবে চলুক আরো কিছু সময়।

২০১৭ সালের ৪ ফেব্রশুয়ারি শের আলী খবর পান সিএমপি’র বন্দর বিভাগে কমর্রত ট্রাফিক কনস্টেবল এনামুল হক সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। ব্যাচমেটের মৃত্যুর খবর পেয়ে মুহুর্তেই ছুটে যায় শের আলী। নিহত এনামুলের রেখে যাওয়া ১১ মাসের ছোট শিশু তাহসিন এর অসহায় মুখ ভাবিয়ে তোলে শের আলীকে। পিতার মৃত্যুতে হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়া শিশুটির ভবিষ্যতের কথা ভেবে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেয় শের আলী। সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে থাকা শের আলীর ব্যাচমেটদের কাছে সহযোগিতার আহ্বান জানায় সে। তার আহ্বানে সাড়া মিল ব্যাপক। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন অনেকেই যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ সদস্যসহ সাধারণ মানুষ। সবার সহযোগিতায় জোগাড় হয় এক লক্ষ নব্বই হাজার টাকা। এই টাকা শের আলী তার নিহত ব্যাচমেটের রেখে যাওয়া শিশু তাহসিনের নামে সোনালী ব্যাংক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ শাখায় একটি এফডিআর হিসাব খুলে জমা রাখে। উক্ত টাকার একমাত্র স্বত্ত্বাধিকারি শিশু তাহসিন। সে সাবালক না হওয়া পর্যন্ত উক্ত টাকা অন্য কেউ উত্তোলন করতে পারবে না।

পরের ঘটনা কিছুদিন পর, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারী। দামপাড়া পুলিশ লাইন থেকে রোজকার মতো বের হয়ে লালদিঘীর পাড় নিজ কর্মস্তল গোয়েন্দা কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন শের আলী। সকাল অনুমান সাড়ে আটটায় লালখান বাজার চাঁনমারি রোডে সড়ক দুর্ঘটনায় সামছুন্নাহার নামে এক মহিলাকে রাচ্চায় পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। তৎক্ষনাৎ তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে ভর্তি করেন।সামসুন্নাহারের ছেলেকে ফোন করে খবর দেন শের আলী।ঐ মা আট দিন হাসপাতালে অবস্তান করেন।এ সময় প্রতিদিন শের আলী ডিউটি শেষ করে ঐ মায়ের খোঁজ-খবর নিতে হাসপাতালে যেতেন।লোক দেখানোর জন্য তো নয়,তবে বেন এ ব্যতিক্রমী চেষ্টা? প্রশ্ন শুনে কিছুটা অবাক শের আলী।বললেন,ব্যতিক্রমী কেন হবে,মানুষ হিসেবে আমি আমার কর্তব্যটুকু করেছি। সবাই তো করে না।শুনে আবারও বললেন,”আমার ভাল লাগে তাই করি”!

Comments are closed.