জাতির সামনে আয়না দেখান,কবিতা শুনিয়ে লাভ নেইঃ

সদ্য গত ২৬শে মার্চ রোববার, ১২ই চৈত্র ১৪২৩ বাংলায় দৈনিক নয়াদিগন্তে মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বানী দিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির যুগ্মমহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই দিন ঢাবির সাবেক উপাচার্য ডঃ এমাজউদ্দীন আহমদ প্রবন্ধ রচিত করলেন “স্বাধীনতা এবং জাতীয় দিবসের মর্মবাণী”নামে। একই পাতায় কবি ও সাংবাদিক নামে আবদুল হাই শিকদার ও লিখেছেন ” স্বাধীনতার ঘোষণা,শহীদ জিয়া ও ২৬মার্চ” নামে কিছু কথা। এসব ছিলো বিএনপি দলের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রকাশনা। প্রথমে বলতে হয় সকলের চেষ্টা করা উচিত, সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলা । কেননা সময়ের পরিবর্তনে জগত বদলে যাচ্ছে, নতুন প্রজম্ম আসিতেছে পুর্বের পুরুষ গত হচ্ছে। দুনিয়ার চিত্র রঙ্গিন ভাবে পাল্টে যাচ্ছে। তবে সৃষ্ট কর্ম, অতীত ইতিহাস কখনো পাল্টানো যায় না। কারন মহাকাল যুগ যুগ ধরে সেসব মহামানবদের কথা মনে রাখে। যেটা আমরা স্বীকার করি বা না করি। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে,মুখের কথায় ইতিহাস চলমান নয় ।কয়েকটি শব্দ সাজালে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হয়ে যাবেনা। ইতিহাস সেটাই যেটা বারবার মুছার পর ও জেগে ওঠে তার নিজস্ব মর্যাদায়। বলতে চেয়েছি বীর মুক্তিযোদ্ধা লড়াকু সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান ও স্বাধীনতার ঘোষক মহান পুরুষ, বাঙ্গালীর স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির পিতা শেখ মুজিবর রহমানের কথা। আমরা কেনো তাদের স্ব স্ব জায়গায় সম্মান দেবোনা? হোক সে আওয়ামীলীগ বা বিএনপির সমর্থক কারন আমরা তাদের কাছে ঋণী। ওদের নিয়ে দুদলের রশি টানাটানি কখনো দেশের জন্য মঙ্গল নয়। জাতি হিসাবে আমরা আজ বড়ই অসহায় সঃস্কৃতিমনা। ইতিহাস বলায় আমরা শক্তিমান,তবে ইতিহাসের তথ্য সংরক্ষণে বড়ই দুর্বল জাতি বাঙ্গালী। স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও বিতর্ক করি কে স্বাধীনতার ঘোষক আর কে বীর মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার। আমাদের উচিত তাদের নিয়ে বিতর্ক না করা। জগতে নেই প্রয়াত মহান দুই ব্যক্তি। তাদের শান্তি দেওয়া উচিত কবরে। বুকের উপর বিশেষ কোন দিনে দুদলের কিছু নেতাদের হাতে টনের উপরে টন তাজা ফুলেল সুবাস দিলে,জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা কখনো কবরে শান্তি পাবেনা। সম্মান কোন জড় বস্তুতে নেই,মনের ভেতরে শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে অন্তরে ভেজাল রেখে কাউকে লোক দেখানো স্মরণ করা বিবেকহীন মানবতা। জম্মকালে জিয়া কখনো মহান নেতা শেখ মুজিবর রহমানকে নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেনি। বুক ফুলিয়ে রাষ্ট্রনায়ক শেখ মুজিবকে স্যালুট জানিয়ে পাশে দাড়িয়ে থাকতো অনড় । কখন কি নির্দেশ দেয় তা পালন করার মানসে। আজ বড় লজ্জার বিষয়, মহান স্বাধীনতা দিবসে তারেই উত্তরসূরী দল বিএনপি নতুন কবিতা রচিত করে ইতিহাসতে পাঁতিহাস বানিয়ে গ্রামের পুকুরে ভাসিয়ে মজা নিতে চায়। আদৌও কি পৃথিবীতে কোন একটি কুচক্র মহলের বানানো ইতিহাস চলে। জগত বিখ্যাত ট্রয় ট্রাজেডি ইতিহাস,বৃটিশ ও মোঘল ইতিহাস কিংবা পলাশী প্রান্তর এমনকি কারবালার নৃশংস ইতিহাস কি বদলানো গিয়েছে। কোনদিন ও তা সম্ভবপর হয়। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার বাণীতে গত ২৬শে মার্চ দৈনিক নয়াদিগন্তে লিখেছেন “১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন।” পরদিন ২৬শে মার্চ তারিখে চট্রগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে উল্লেখ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন” এটাই হলো নব্য ইতিহাসের বড় বিচিত্র কবিতা। কেননা একই দিনে মির্জা ফকরুল ইসলাম একই পত্রিকায় বানী দেয়। আর বানীতে লিখেন ” তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক হিসাবে কর্মরত মেজর জিয়াউর রহমান চট্রগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন”। এতে কি স্পষ্ট প্রমাণিত হয়না, তাদের ইতিহাস বানানো কলা। যা পাকা কলা হিসাবে জনগনের মুখে ফুরে দিতে চায়। মির্জা ফকরুল নিজেই বল্লেন ,তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ অধিনায়ক মেজর জিয়া,আর অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়া ঠিক একই সময়ে বলেন, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বড় আজব বিষয়। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে পদে বহাল থাকা কর্মরত মেজর জিয়া কি করে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে সেসময় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এত বড় বানানো ইতিহাস জনগণ কেমনে মুখস্ত করবে। ১০টি সেক্টর কমান্ডারের একজন যদি হুট করে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হয়ে যায় বাকিরা কি তাহলে? স্বাধীনতার ঘোষণা কি এতই সহজ,রক্ত আর মা বোনের ইজ্জতে কেনা স্বাধীনতা কি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হতে প্রবেশ করা কোন সন্তান। ৯ মাসের যুদ্ধ কি তাহলে কোন বিষয় বা ইতিহাস নয়!! এমন মিথ্যা বানোয়াট কল্পকাহিনী বন্ধ করে আমরা কি স্ব স্ব মহিমায় মুজিব ও জিয়াকে সম্মান জানাতে পারিনা। নাকি স্বাধীনতা প্রত্যাশী সে সময়ের মহান নেতা শেখ মুজিবর রহমানের চেয়ে, তারপক্ষে পাবলেসিটি করা সংবাদ পাঠক স্বাধীনতার ঘোষক হবে!! জনগণের কাছেই প্রশ্ন রইলো!! কেমন দেশে বসবাস করি,মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলাম নিয়ে পাশ করা জেএমবি নেতা শাইখ আব্দু রহমান এর মতো গুটিকয়েক লোক ধর্ম বেশি বুঝে। ইসলামী জিহাদ চায় অথচ তৎকালিন বিএনপির আমলে বলা হলো নেজামীর কন্ঠে এসব মিডিয়ার সৃষ্টি। তাহলে সব সময় জাতির কাছে কেনো এতো মিথ্যাচার আমাদের নতুন প্রজম্মের সামনে। কেনো ইতিহাস বানাতে চান আপনারা। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে জিয়া কি কোন পাপ করেছে আপনাদের দৃষ্টিতে। স্বাধীনতার ঘোষকের চেয়ে মহান মুক্তিযোদ্ধার অবদান কম কিসে, জবাব চাই? রাজনীতি না করে, সেনাবাহিনীতে চাকরি করে কি স্বাধীনতার ঘোষক হওয়া যায় এতই সহজ? বিশ্বের কোন দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে। তাহলে কেনো ইতাহাসকে সঠিক পথে চলতে দিচ্ছেন না বুদ্ধপাপাী মানুষ । পুর্বের বিএনপি বা আজকের বিএনপি সকলের প্রতি জানতে চাই। দেশে আওয়ামীলীগ সরকার বর্তমানে, যখন আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় ছিলোনা তখনও মহান ২১শে ফেব্রুয়ারী, ২৬শে মার্চ,১৫ই আগষ্ট,৭ই মার্চ সহ বিভিন্ন দিবসে প্রয়াত মহান পুরুষ জগত বিখ্যাত রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধুর

নানা ভাষণ প্রচার করে দলটি। দয়া করে বলবেন কি,কল্পিত স্বাধীনতার ঘোষক দাবিদার সেনাকর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমানের কোন ভাষণ,রাজনীতির নানা বক্তব্য বা ইতিহাস জনগণের কাছে আপনারা প্রচার করেছেন কি? ৪৬ বছরে এমনকি পুর্নাঙ্গ কোন জিয়ার স্বাধীনতার ভাষণ শুনিয়েছেন কি। নাকি তলের বিড়াল বেরিয়ে যাবে বলে সব লুকিয়ে রেখেছেন!! কারন ২৬শে মার্চে মেজর জিয়ার ঘোষনায় স্পষ্ট উল্লেখ ছিলো তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে নির্দেশ দিয়েছে। এর পরেও কি বলবেন জিয়া স্বাধীনতার নায়ক,নাকি স্বীকার করে নেবেন জিয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা। শ্রদ্বেয় সাংবাদিক আবদুল হাই শিকদার কোন নিয়মে, কোন বিধিতে আপনি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণকে আপোস আর সমঝোতার দরোজা হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। পৃথিবীর কোন বলদ কি বিশ্বাস করবে সেদিনের আগুন ঝরা বিপ্লবী ভাষণ “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো,এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ,,”ঘরে ঘরে দুর্গ গড় তোল,তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো,,” আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা সব বন্ধ করে দেবে,,”এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,, কলামিষ্ট শিকদার সাহেব,এসব কি আপোস আর সমঝোতার শব্দ। বাংলা ব্যাকরণ কতোটা বুঝেন জানিনা। তবে কোটি কোটি মানুষের কাছে যা সংগ্রাম মনেহয়,স্বাধীনতার ঘোষণা মনে হয় তা আপনাদের কাছে আপোষ আর সমঝোতা নামে পাতানো নাটক। আপনি নিজেই লিখেছেন ১৭৫৭ সালে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ও গোষ্টি ব্রিটিশদের কাছে কল্কি পাবার লোভে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পুত চরিত্রে কলংক মাখানোর জন্য দালালিতে উদ্মাত হয়েছিলো,তবে আজ বলতে ইচ্ছা করে ১৭৫৭ সালের পলাশী প্রান্তর থেকে সরাসরি ২০১৭ সালে এসে কোন হীন নাটকে বলেন যে,৭ই মার্চের ভাষণ আপোস আর সমঝোতার নাটক। এ লজ্জা কার!! জাতির ভাগ্য কোনদিকে, না এসব নাটকের বিকৃত রুচি। ধিক্কার আপনাদের এসব বানানো ইতিহাসকে। জোর করে খলনায়ককে নায়ক বানানো যাবেনা আর নায়ককে কল নায়ক। স্বাধীনতার ৪৬ বছরে ১৫টি বছর বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় বসে, নিজেদের মনগড়া তৈরিকৃত বিকৃত রুচির বানানো জিয়া ঘোষক ক্যাসেট চালালো দেশে,তারপরেও জনগনের মনে জায়গা নেই স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে জিয়ার নাম। কেনোনা বারবার ইতিহাস চলে ইতিহাসের সমান চাকায়, বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষক আর বাংলাদেশের ইতিহাস। ২০০০ সালের ২০শে মার্চ আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ঢাকা সফরে এসে বলেছিলেন “২৯ বছর আগে এই মাসে অসাধারণ প্রতিবন্ধকতার মুখে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে এক নিঃসঙ্গ অভিযান শুরু করেছিলো বাংলাদেশ এবং বিশ্বের অনেক দেশের নিকট থেকে তখন তার প্রাপ্য সমর্থন লাভ করেনি” ডঃ এমাজউদ্দিন স্যার নিজেই তার কলামে গত ২৬শে মার্চ বলেছেন” সেই নিঃসঙ্গ অভিযানে বাংলাদেশের জনগণ মৃত্যুর মুখ থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হন। একটি মাত্র কারণে তা হল জাতি ধর্ম বর্ন সম্প্রদায় নির্বিশেষে সম্মিলিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন বলে। আর এটা কি স্বীকার করবেন না স্যার,এই অসম্ভব কাজটি যিনি সমপন্ন করতে পেরেছিলেন তিনি হলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। যে মহান নেতার ডাকে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ সুচারুরূপে কৌশলী বক্তব্যে ৭কোটি মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। সেই মহান স্বাধীনতার ঘোষক শেখ মুজিবের একটি ভাষণ পাল্টে দিয়েছিলো ৭ কোটি মানুষের হৃদয়। গ্রাম্য আবালবৃদ্ধবনিতা সকলে উৎসাহ প্রেরণা পায় নিরস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার। ইতিহাস আয়নার মতো সহজ,আয়নার সামনে দাড়ান সব দেখতে পাবেন। কাউকে খুশি করতে নষ্ট কবিতা শুনাবেন আগামী প্রজম্মকে। সঠিক কার্য সম্পাদন অনুযায়ী যার যার প্রাপ্য সম্মান দিতে শিখি,রাতকে দিন আর দিনকে রাত বানাতে চেষ্টা করা কারো উচিত নয় । কারন সৃষ্টির অমোঘ নিয়মে পৃথিবীর দিন রাত চলে, ইতিহাসের আবর্তে ইতিহাস চলবে। আপনি বা আমরা জোর করে কাউকে স্বাধীনতার ঘোষক বানাতে পারবোনা। কেননা এটা কোন ২মিনিটে রচিত কবিতা নয়,কাগজে লিখা কোন প্রচার পাঠ করে ঘোষক ইতিহাস নয়। জনগণ আর ইতিহাস থেকে অর্জন করতে হয়,কে স্বাধীনতার ঘোষক আর নায়ক। আমাদের দৃষ্টিকোণ বদলাতে হবে, তখন সব স্বচ্ছতায় দেখবেন। হাওয়া তৈরি করে চাওয়ার বাসনায় ইতিহাস নয়। দয়া করে জাতির সামনে আয়না দেখান,বানানো কবিতা নয়!!
জে,জাহেদ সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
দৈনিক আমাদের অর্থনীতি ও দৈনিক আমাদের সময় অনলাইন।
zahednews1987@gmail.com

Comments are closed.