অতএব জানুন: আচরণে আপনার পরিচয়

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ এশীয় একজন রাষ্ট্রনায়ক সফরে গেছেন ইউরোপের এক ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক দেশে। বিমানবন্দরের বাইরে হট্টগোল। একদল মানুষ বিক্ষোভ দেখাচ্ছে অতিথি নেতার বিরুদ্ধে। কুশপুত্তলিকা দেখাচ্ছে। এশীয় নেতা বিব্রত হলেও অভ্যর্থনাকারী মন্ত্রীর উদ্দেশে হাসলেন। বললেন, আমি দেখতে মোটেই সুদর্শন নই। সে ঠিক আছে। কিন্তু ওদেরকে বলো, ওরা আমার যে মূর্তিটা (কুশপুতুল) নিয়ে এসেছে, আমি দেখতে অতটা কুদর্শনও নই।

ইংরেজি ভাষায়—‘এটিকেট’, ‘ম্যানারস’। বাংলায় আচরণ, ভব্যতাবোধ, শিষ্টাচার, সদাচার।

আচরণবিদগণ বলছেন, এটিকেট বা শিষ্টাচার শেখার বিষয়। প্রাতিষ্ঠানিক শেখার বিষয়। শেখানো যেতে পারে পরিবারে, স্কুলে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে কিংবা ক্লাবে। কাউন্সিল বা সংস্কৃতিকেন্দ্রে। এটিকেট হলো সংস্কৃতিমান হওয়া। সংস্কৃতি শেখা। এখন তো আচরণ শিক্ষার প্রয়োজন এতটাই বেড়েছে— আচরণবিদ বলে একটা পেশাই তৈরি হয়েছে। আচরণ শিক্ষার কেন্দ্রও চালু হচ্ছে দেশে দেশে।

এটিকেটের সঙ্গে এখন বিশেষজ্ঞরা রসবোধ, প্রত্যুৎপন্নমতি বা উপস্থিত বুদ্ধিমত্তাকেও যোগ করছেন। তাঁরা বলছেন, শিষ্টাচার একজনকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও প্রিয়পাত্র করে তোলে। কারও আচরণ যদি হয় রূঢ়, কদর্য ও বর্বর; সেটা সবার কাছে ভয়ের বার্তা পৌঁছে দেয়। কিন্তু মানুষটাকে জনপ্রিয় করে না। একজন রিকশাচালকের সঙ্গে আমার আচরণ কেমন হবে। তাঁর সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দরদস্তুর কোন ভাষায় করব। তাঁকে কি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করব, অসম্মান করব? নাকি সম্মানজনক আচরণ করে তাঁর শ্রমের মর্যাদা দেব?

সমকালীন জীবনযাপনের নানা ঘটনার অভিজ্ঞতায় বলা যায়, সদাচার বা মর্যাদাপূর্ণ আচরণই বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যকে ছোট করে শেষে নিজেরও ছোট হতে হয়। কাউকে অসদাচরণের বশে ‘তুই-তোকারি’করে অবশেষে নিজেও ‘তুই-তোকারি’ সম্বোধনের শিকার হতে হয়। আত্মসম্মানবোধ মানুষের সহজাত। কারও সম্মানে আঘাত করলে সে পাল্টা আঘাত করবেই।

আমরা হলিউড-বলিউডের নানা আলোঝলমলে অনুষ্ঠানে সুশিক্ষিত শিষ্টাচারের প্রশিক্ষিত নানা দৃষ্টান্ত দেখি। শন কনারি, অমিতাভ বচ্চন, মাধুরী দীক্ষিত, ধর্মেন্দ্র, শাহরুখ খান— তাঁদের কথা বলার ভঙ্গি, বিনয়, ভাষাপ্রয়োগ আমাদের অনুপ্রাণিত করে। অগ্রজের প্রতি সম্মান, অনুজপ্রতিমের প্রতি স্নেহভাষা আমাদের আপ্লুত ও মুগ্ধ করে।

ফিল্মি দুনিয়ার দৃষ্টান্ত এ কারণে দিলাম, সেখানে আপন প্রতিভার গুণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন অনেকে বড় তারকা হন। কিন্তু পাদপ্রদীপের আলোর দুনিয়ায় গিয়ে নিজেকে বদলে ফেলেন। আচরণবিদ রেখে প্রশিক্ষণ নেন শিষ্টাচারের।

সদাচারের গুরুত্ব ও তাগিদ দিয়েছে বিশ্বের সব ধর্ম। আদিকাল থেকেই। ভারতীয় ঋষি দধিচী সেই পুরাকালে অতিথি সৎকার করেছিলেন আপন হাড্ডি দিয়ে। আরবের রাষ্ট্রনায়ক খলিফা উমর উটচালকের সঙ্গে পরিশ্রম ভাগ করে নিতেন।

এসব কাহিনি তো সুবিদিত।

আমরা কতটা সচেতন?

ধন্যবাদ বলুন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। আচার, ব্যবহার, শিষ্টাচার— শব্দগুলো বইয়ের পাতায় থাকলেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রকাশ, ব্যবহার সম্পর্কে আমরা কতখানি সচেতন? আজ সমাজের নানা স্তরে এর ঘাটতি আমাদের বিভিন্নভাবে অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একসময় বাবা, চাচা বা মুরব্বিদের সামনে কেউ সিগারেট খাওয়ার কথা ভাবতেও পারত না। প্রেমিক-প্রেমিকা নিয়ে তো দূরের কথা, নিজের বউয়ের সঙ্গে সময় কাটাতে অনেকে সংকোচ বোধ করত। সিনে ম্যাগাজিন বা অ্যাডাল্ট ফিল্ম লুকিয়ে দেখত। শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক ছিল বাবা-সন্তানতুল্য।

বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়া সবখানে। সবার একই কাতারে বসে সিগারেট খাওয়া, সিনেমা দেখা, লেকপাড়ে প্রেমিক-প্রেমিকার জুটি নতুন কোনো বিষয় নয়। এই যে দূরত্ব ঘুচে গেছে সিনিয়র-জুনিয়রের, তাতে কি লাভ হলো না ক্ষতি হলো? ধৃষ্টতা শব্দটি সমাজে গেঁথে বসল। আর গুরু-শিষ্যের যে দূরত্ব বা কাছে আসা, তা আগেও ছিল, এখনো আছে।

 

একজন মা এলেন তাঁর ছেলেকে নিয়ে। সমস্যা, তাঁর ছেলের ব্যবহার খুবই খারাপ। গৃহকর্মীদের দিকে কুনজর। ছেলের বাবারও জোয়ান বয়সে এ রকম অভ্যাস ছিল। পিতাপুত্র দুজনের কাছেই বাজে ব্যবহার করা ডাল-ভাত। স্বামী এখন বয়স হওয়ায় সমস্যা করেন না। কিন্তু ছেলে বাবার মতোই সিগারেট খায়। একে নিয়ে কী করতে পারেন সেই পরামর্শের জন্য এসেছেন।

এখন যা করণীয়। আচরণ শিক্ষার প্রাথমিক ও প্রধান শিক্ষালয় হলো পরিবার। শিষ্টাচার শেখার পাঠ শুরু হতে হবে এখানেই। আমার মন্দ আচরণ সংক্রমিত হবে সন্তানের মধ্যে। একইভাবে আমার একটি ভালো অভ্যাস অনুপ্রাণিত করবে তাকে। মন্দ আচরণ বর্জন, সদাচরণ অর্জন— সেটা ঘরের মধ্যে, সামাজিক অনুষ্ঠানে, আত্মীয়স্বজনের মিলনমেলায়, হাটেবাজারে সব জায়গায় আচরিত হতে হবে।

যে স্কুলে সন্তানকে পাঠাচ্ছি, খেয়াল রাখতে হবে, সেখানে সে সদাচরণ শিখছে কি না। কাদের সঙ্গে মিশছে। দেশের উন্নত স্কুলগুলোতে আগে শিষ্টাচারও শিক্ষণীয় ছিল। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, দিল্লি, কলকাতা, দার্জিলিং— সব শিক্ষা শহরে জেলা স্কুল ও মিশনারি স্কুলে উন্নত আচরণবিধিও সযত্নে শেখানো হতো। এখনো হয়। হলিক্রস, নটর ডেম, সেন্ট যোসেফ স্কুল-কলেজ আজও এ জন্য সর্বমহলে সম্মানিত। স্কুল, কলেজ পর্যায়ে আচরণ শিক্ষা অবশ্য অনুসরণীয় হওয়া একান্ত দরকারি।

১০ পরামর্শ

আচরণবিদেরা বলছেন, শিষ্টাচার হচ্ছে কিছু অভ্যাসের সমষ্টি। ‘গুড ম্যানারস’কেন দরকার? ক্ষতিকর ও নেতিবাচক দ্বন্দ্ব-সংঘাত পরিহারের জন্য। কূটকচালী না করা। কাজের জায়গায়ই কাজই পরম ধর্ম। সেটাই কল্যাণ ও সাফল্য আনবে। নিজেকে আত্মপ্রত্যয়ী, সুসংগঠিত ও হালনাগাদ রাখা। দুশ্চিন্তা, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও অবৈজ্ঞানিক চিন্তা-চেতনা থেকে দূরে থাকা। আচরণ শিক্ষার জন্য খুবই সরল কিছু উপায় বাতলে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

● যখন কিছু নেবেন, ‘প্লিজ বা অনুগ্রহ করে’ বলুন।

● উপকারকে স্বীকৃতি দিন। বিনিময়ে কিছু অবশ্যই দেবেন, প্রতিশ্রুতি দিন এবং রক্ষা করুন।

● অন্যের জিনিসকে নিজের মতো ভেবে যত্ন করুন। অন্যের গুণাবলি অনুসরণ করুন। দোষ পরিহার করুন।

● ধন্যবাদ বলুন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।

● চোখের ভাষা ও নজর নম্র রাখুন। হাসিমুখে কথা বলুন। সম্মান দেখান। সহমর্মিতা প্রকাশ করুন।

● সমতা বা সবাইকে সমানভাবে দেখার অভ্যাস রপ্ত করুন। যোগাযোগের ক্ষমতা বাড়ান। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি রক্ষা করুন।

● ভিন্ন মত, অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান, সহনশীলতা দেখান।

● নিজের ভুলকে অনুধাবন করুন। স্বীকার করুন। এটা আপনাকে দুর্বল করবে না, বরং সম্মানিত ও শক্তিশালী করবে।

● ভুলকে জায়েজ করতে কোনো খোঁড়া অজুহাত দেবেন না।

● ভুলের জন্য ক্ষমা চান। সে জন্য নিজেকে নানা পরিস্থিতিতে প্রস্তুত রাখুন। প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞা করুন, এমন ভুল যেন ভবিষ্যতে না হয়। কানকথা শুনবেন না। ইগো নয়, নিজের বিবেকের নির্দেশ অনুসরণ করুন।

Comments are closed.