ঈদগাঁওতে এক গৃহবধূ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থের অভিযোগ

 ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, ইভটিজিং সহ নানা অপরাধে অভিযুক্ত স্বামী জামাল মিয়া

মোঃ রেজাউল করিম

একই অধিদপ্তরে একই ঘটনায় আইনের ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োগে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের এহেন কর্মকান্ড নানা বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। সময়োচিত পদক্ষেপ এর অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভিকটিম। কক্সবাজার সদর উপজেলার ঈদগাঁও খোদাই বাড়ি এলাকার এক নির্যাতিতা মহিলা  মরিয়ম (নাম প্রকাশের অনীহার কারণে ছব্দনাম ব্যবহার হয়েছে) অভিযোগ করে জানান, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ চাকুরী বিধিমালা সঠিক প্রয়োগ করছেন না। একেকজনের বেলায় এক এক রকম আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। অথচ নিয়ম ছিল সকলের ক্ষেত্রে একই আইন প্রয়োগ করা। তিনি বলেন, তার স্বামী মোঃ নুর জামাল মিয়া বর্তমানে নরসিংদী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের গার্মেন্টস ডিজাইন অ্যান্ড প্যাটার্ন মেকিং টেকনোলজি (জি,ডি,পি,টি) বিভাগের জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর। ২০১২ সালে ঐ শিক্ষকের সাথে তার বিয়ে হয়। তখন তিনি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একই বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হিসাবে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব ছিলেন। পূর্ব বিয়ের তথ্য গোপনের মাধ্যমে তিনি তাকে বিয়ে করেন। ওই ঘরে তার তিন সন্তান- সন্তুতি ও ছিল। পরে তিনি তাকে ডিভোর্স দেন। এরপরও ভবিষ্যৎ সুখের আশায় তিনি তার সাথে দীর্ঘ পাঁচ বছর সংসার করেন। এসময় তার স্বামী জামাল মিয়া ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, ইভটিজিং সহ নানা অপরাধে অভিযুক্ত হন। বিগত প্রায় সাড়ে তিন বছর যাবত তিনি বাধ্য হয়ে পিত্রালয়ে অবস্থান করছেন। এ সময় স্বামী তার খোঁজ খবর নেয়া তো দূরের কথা বরং তাকে বিভিন্ন সময়ে শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চালিয়ে আসছিল। গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশ্য দিনদুপুরে স্বামী তার পিত্রালয়ে এসে তিনি, তার মা ও ছোট বোনকে কোপানো সহ অমানুষিক নির্যাতন করেন।

এ-সংক্রান্ত ঘটনায় পরদিন ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলা করেন। ফৌজদারি আইনে দায়েরকৃত এ মামলার নম্বর ৩৫/৭১৭। ১৭ অক্টোবর স্বামী জামাল মিয়া অন্য দুই৷ জনসহ কক্সবাজার শহরের হোটেল আল গনি থেকে আটক হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস,আই মোঃ দস্তগীর হোসাইন পরদিন ১৮ অক্টোবর তাদেরকে জেলহাজতে সোপর্দ করেন। এ সংক্রান্ত রিপোর্টে মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে আটক আসামীদেরকে জেলহাজতে রাখতে তিনি চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর আবেদন করেন। আটককৃতরা হচ্ছে টাঙ্গাইল জেলার সখীপুর উপজেলার বাঘের বাড়ি ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামের মৃত বন্দে আলী মিয়ার পুত্র মোঃ নুর জামাল মিয়া (জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর ও ভুক্তভোগীর স্বামী), তার আত্মীয়, একই এলাকার আবেদ আলী মাস্টারের পুত্র ফরিদ হোসাইন এবং উক্ত জেলা ও উপজেলার বড়চওনা ইউনিয়নের জিতাসরী গ্রামের আব্দুল বারেক এর পুত্র শফিকুল ইসলাম। শেষোক্ত দুইজন বর্তমানে কক্সবাজার শহরে ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তারা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা- আইওএম এ কর্মরত। এদের মধ্যে একজন সংস্থাটির পক্ষ থেকে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকুরী করে আসছেন। দীর্ঘ ২৪ দিন কারাভোগের পর স্বামী নুর জামাল দুই হাজার টাকা মুচলেকায় জামিন পেয়ে

নরসিংদী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে গিয়ে গত ১১ নভেম্বর যোগদান করেন। এর আগে তার নির্যাতিতা স্ত্রী কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের নিকট গিয়ে মোঃ নুর জামালের বিরুদ্ধে মামলার কাগজপত্র, পূর্বোক্ত কর্মস্থলের বিভিন্ন অপকর্মের পেপার কাটিং সহ অন্য ডকুমেন্ট দাখিল করে বিধিমতে তাকে সাময়িক বহিষ্কারসহ অন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার আবেদন জানান। আবেদনের একটি কপি নরসিংদী সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ বরাবর ও পাঠান। নির্যাতনের শিকার মহিলাটি কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে নেয়া চাকুরী বিধিমালার অংশবিশেষ উপস্থাপন করে জানান যে, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ২১/১১/১৯৭৮ তারিখের স্মারক নম্বর ইডি(রগ-৬)-এস-১২৩/৭৮/১১৫(৫০০) মোতাবেক কোন সরকারি কর্মচারী গ্রেপ্তারের পর বা আত্মসমর্পণের পর জামিনে মুক্তিলাভ করলেও মামলার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায়ই থাকবেন। কোন সরকারি কর্মচারী গ্রেপ্তার হওয়ার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি করতে হবে এবং বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত উক্ত আদেশ বহাল রাখতে হবে। আইনটিতে আরো বলা হয়েছে, কোন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদাচারণ, ডিজারশন বা দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় কার্যক্রম গ্রহণের সিদ্ধান্ত হলে সেক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ সমীচীন মনে করলে উক্ত কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারবেন।

রেফারেন্স হিসেবে এ ভিকটিম মহিলাটি উল্লেখ করেন যে, গেল বছরের ২৭ জুলাই আগ্রাবাদ মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের গার্মেন্টস ডিজাইন অ্যান্ড প্যাটার্ন মেকিং টেকনোলজি বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান সিএমপির আওতাধীন চট্টগ্রামের হালিশহর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- ২০১৮ এর আলোকে অত্র পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একই বিভাগের অপর এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা (নঃ ২৩/১৮৫) দায়ের করেন। পরবর্তী মাসের প্রথম তারিখ (১ আগস্ট) কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যথাসময়ে এ মামলার একমাত্র আসামি তথা ওই শিক্ষককে সাময়িক সাসপেন্ড করেন। মামলার কার্যক্রম শেষ না হওয়ায় বর্তমানে তিনি সাসপেন্ড অবস্থায় আছেন। এর কয়েক বছর পূর্বে অত্র মহিলা ইনস্টিটিউটের একই বিভাগের অন্য আরেক শিক্ষকের স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক ও চাকুরি হারান। তাছাড়া এ একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরো একজন অভিযুক্ত শিক্ষকের ও এভাবে চাকুরী চলে যায় বলে সূত্রে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী মহিলা প্রশ্ন তুলেন যে, একই ধরনের ঘটনায় আইনের ভিন্ন প্রয়োগ কেন? আইনের অপপ্রয়োগ এর ফলে তিনি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তার স্বামী জেল থেকে জামিনে এসে তাকে নানাভাবে হুমকি ধামকি দিচ্ছেন। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের এমনতর কর্মকাণ্ডে তিনি চরমভাবে অবহেলিত ও অধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন। ন্যায় বিচার পাচ্ছেন না।

 

পেয়ে ঢাকার বাইরে অন্য প্রতিষ্ঠানে উপাধ্যক্ষ হিসেবে বদলি হয়েছি। পরে আমাকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে আবারো পদায়ন করা হয়। আমাকে যেহেতু সহকারি পরিচালক থাকাকালে এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এখন যেহেতু আমি সে দায়িত্বে নেই। তাই পদোন্নতির পরে নতুন করে বর্তমান পদবী অনুসারে কর্তৃপক্ষ আমাকে আবারো দায়িত্ব দিলে আমি যথাযথভাবে তদন্ত করব ইনশাআল্লাহ।

বর্তমানে তদন্তের দায়িত্বে না থাকলেও ভিকটিমের সাথে কেন যোগাযোগ করেছেন জানতে চাইলে এ নারী কর্মকর্তা বলেন, কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের জন্য আমি তাকে ফোন দিয়ে প্রাসঙ্গিক তথ্য উপাত্ত দিতে বলেছিলাম। ভিকটিম প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করলে আমি তা কর্তৃপক্ষ বরাবর উপস্থাপন করব।

কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত তথ্য দেয়া যায় না জানিয়ে তিনি রিপোর্টে তার নাম ও পদবী ব্যবহার না করার অনুরোধ করেন।

তিনি নিজেকে অধিদপ্তরের পদস্থ কোন কর্মকর্তা নয় বলে জানান এ প্রতিনিধিকে। তিনি আরো জানান, পদবী পরিবর্তন হওয়ায় দাপ্তরিকভাবে তিনি এখন আর তদন্তের দায়িত্বে নেই। আর মন্তব্য করেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নারী হিসেবে তিনি অভিযোগদাতার সাথে কথা বলেছেন। কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশক্রমে যা করার তাই করবেন। অর্থাৎ দায়িত্ব পেলে সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে এ বিষয়ে কথা বলবেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাময়িক অব্যাহতি দেয়ার ক্ষমতা বা এখতিয়ার উনার নেই। কেবল নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ আদেশ জারি করতে পারেন।

নুর জামালের জেলহাজতে থাকার বিষয়টি জানেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে থাকবে।

তিনি বর্তমানে তার মূল পদবী ঢাকার বাহিরের প্রতিষ্ঠানে জানিয়ে আরো বলেন, পুনরাদেশ পেলে অবশ্যই এ বিষয়ে কাজ করব। দায়িত্ব দিলে আপনাদের যে কোনো ধরনের তথ্য সরবরাহ করবো।

সর্বশেষ এ বিষয়ে কথা হয় কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক (এডি-১) মোঃ জাহেদুল কবির খানের সাথে। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট মহিলার অভিযোগ ও এতদ সংক্রান্ত তথ্যাদি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন মন্ত্রণালয় থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে তা বাস্তবায়নের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। তদন্ত কার্যক্রম এর ব্যাপারে কিছু জানেন কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, তদন্তের বিষয়টি আলাদা। অভিযোগের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে বিলম্ব হয়ে গেছে। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। অধিদপ্তরের সে রকম কোনো ক্ষমতা নেই। অধিদপ্তর কেবল কার্যক্রম অগ্রায়ন করেন। তবে অভিযুক্ত শিক্ষক মোঃ নুর জামাল মিয়া সাময়িক বরখাস্ত হতে পারেন বলে মন্তব্য করেন এ পদস্থ কর্মকর্তা।

উপরোক্ত অভিযোগের ব্যাপারে অভিযুক্ত নরসিংদী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের গার্মেন্টস ডিজাইন অ্যান্ড প্যাটার্ন মেকিং টেকনোলজি বিভাগের (জিডিপিটি) জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর নুরজামালের মোবাইলে একাধিকবার

কল করলেও মোবাইল বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে তিনি কোনো বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া দিলে তা যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে।

Comments are closed.