কুফার পথে ইমাম হোসাইন (রা.)

মুহাম্মাদ রবিউল হক

হজরত হোসাইন ইবন আলী (রা.) পরিবার-পরিজনসহ কুফা থেকে আগত ৬০ জন মানুষের ক্ষুদ্র কাফেলা নিয়ে কুফার পথে যাত্রা শুরু করলেন।

তার কুফা যাত্রার কথা শুনে মানুষ উদ্বিগ্ন ও বিচলিত হয়ে পড়লো। হিতাকাঙ্ক্ষীরা তাকে কুফায় না যাওয়ার জোর পরামর্শ দিলেন।

ইবন আব্বাস (রা.) বললেন, ‘কুফাবাসী হলো বিশ্বাসঘাতকের জাত। সুতরাং তাদের কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে আপনি এখানেই অবস্থান করতে থাকুন, তারা যখন তাদের শত্রুকে শহর ছাড়া করবে তখন আপনি যাবেন।’

ইবন উমর (রা.) একইভাবে তাকে নিষেধ করলেন। কিন্তু তিনি ফিরে আসতে অসম্মতির কথা জানান। এ সময় ইবন উমর তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। আব্দুল্লাহ ইবন যোবায়েরও ইমাম হোসাইনকে নিষেধ করলেন।

আবু সাঈদ খুদরী, জাবির ইবন আব্দুল্লাহ এবং সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবও তাকে নিষেধ করলেন। পথে কবি ফারাযদাকের সঙ্গে দেখা হলে তিনি তাকে মানুষের মনোভাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন।
ফারাযদাক বললেন, ‘হে রাসূল তনয়!

হৃদয়তো আপনার সঙ্গে কিন্তু তলোয়ার আপনার বিরুদ্ধে। তবে বিজয়ের ফয়সালা আসমানে।’ (আলী মিয়া নদভী, হজরত আলী রা: জীবনও খিলাফত, ই. ফা.বা. অনূদিত, পৃ২৫১)

পথিমধ্যে মুসলিম ইবন আকীল এবং হানী ইবন উরওয়ার শাহাদাতের সংবাদ পেয়ে বারবার তিনি ‘ইন্না লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়তে লাগলেন। সবাই তাকে নিজেকে রক্ষা করতে বিনীত অনুরোধ জানালেন।

হোসাইন (রা.) বললেন, ‘এ দুজনের শাহাদাতের পর বেঁচে থাকায় আর কোন কল্যাণ নাই।’

হাজির অঞ্চলে পৌঁছে তিনি বললেন, আমাদের সমর্থকরা আমাদের ত্যাগ করেছে সুতরাং তোমরা যারা ফিরে যেতে চাও নিঃসংকোচে যেতে পারো। কারো উপর আমাদের পক্ষ হতে আনুগত্যের দায়বদ্ধতা নেই।

এ ঘোষণার পর পথে যারা তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল তারা সবাই কেটে পড়লো। শুধু মক্কা থেকে যারা এসেছিল তারাই রয়ে গেলো। হুর ইবন ইয়াজিদ রায়াহী সহযোগীদের নিয়ে ইমাম হোসাইন থেকে পৃথক হয়ে গেলো। (ইবন কাসীর,আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খ-৮,পৃ-১৬৭)

ওবায়দুল্লাহ ইবন জিয়াদ উমর ইবন সাআদ ইবন আবি ওয়াককাসকে হোসাইনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে পাঠালো।

বিনিময়ে ইবন জিয়াদ তাকে ইরাকের রাঈ প্রদেশের গভর্নর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। মুগিরা ইবন শু’বার (রা.) ছেলে হামযাহ উমর ইবন সাআদকে হুসাইনের বিরুদ্ধে লড়াই না করার অনুরোধ করেছিল এবং ভৎসনাও করেছিল।

সে কর্ণপাত না করে চার হাজার যোদ্ধা নিয়ে কারবালার প্রান্তরে হোসাইন (রা.) ও তার সঙ্গিদের মুখোমুখি হলো।(ইবন আসাকির, তারিখু মদীনাতা দিমাস্ক, খ-৪৫,পৃ-৪৮)

হোসাইন (রা.) তাকে বললেন, ‘হে উমর! আমার তিনটি প্রস্তাবের যে কোন একটি গ্রহণ করো। হয় আমাকে যেভাবে এসেছি সেভাবে ফিরে যেতে দাও। আর তা না হলে আমাকে ইয়াজিদের কাছে পাঠিয়ে দাও। আমি তার হাতে বাইয়াত হবো। তাও যদি গ্রহণযোগ্য না মনে করো তাহলে আমাকে তুর্কী দেশে পাঠিয়ে দাও। মৃত্যু পর্যন্ত আমি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবো।’

প্রস্তাবগুলো ইবন জিয়াদের বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হলো, সে তখন হোসাইনকে (রা.) ইয়াজিদের কাছে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল, তখন নরাধম শিমার ইবন যিল জাওশান বাধা দিয়ে বলল, আপনার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কিছু গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ইবন জিয়াদ হোসাইনকে (রা.) এ কথা জানিয়ে দিলে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর শপথ এটা আমি করবো না।’

উমর ইবন সাআদের সঙ্গে কুফার ৩০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিল। তারা তাকে বললো,নবী-কন্যার পূত্র তোমাদের সামনে তিনটি প্রস্তাব পেশ করেছেন আর তোমরা একটিও গ্রহণ করবে না!

একথা বলে তারা হোসাইনের (রা.) সঙ্গে যোগ দিলেন। (ইবন কাসীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া,খ-৮,পৃ-১৭০)

ইবন জিয়াদ শিমার ইবন যিল জাওশানকে এই নির্দেশ দিয়ে পাঠালো উমর যদি লড়াই করতে অনীহা প্রকাশ করে, তুমি তাকে হত্যা করে তার স্থান গ্রহণ করবে।

আরো নির্দেশ দিলো, হোসাইন ও তার সঙ্গীদল তরবারি সমর্পণ না করা পর্যন্ত পানি অবরোধ করে রাখবে, যেন তারা ফোরাত হতে এক ফোঁটা পানিও সংগ্রহ করতে না পারে।

পক্ষান্তরে হোসাইন (রা.) সঙ্গীদের নির্দেশ দিলেন, ‘ফোরাতের পানি সংগ্রহ করে নিজেরা পিপাসা নিবারণ করবে, নিজেদের ঘোড়াগুলোর সঙ্গে শত্রুদের ঘোড়াগুলোকেও পানি পান করতে দেবে।’

৯ মুহররম বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তারা হোসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীদলের দিকে অগ্রসর হলো। সেই রাত্রে হোসাইন (রা.) তার পরিবার-পরিজনকে প্রয়োজনীয় অছিয়ত করলেন এবং সাথীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ প্রদান করলেন।

শুক্রবার সকালে হজরত হোসাইন (রা.) ফজরের নামাজ আদায় করলেন। সেদিন ছিলো আশুরার দিন। তার সঙ্গীদের মধ্যে ছিল ৩২ জন যোদ্ধা আর ৪০ জন পুরুষ।

ইমাম হোসাইন ঘোড়ায় আরোহন করলেন এবং একখন্ড কোরআন নিজের সামনে রাখলেন। তার পুত্র আলী ইবন হোসাইনও ঘোড়ায় আরোহন করলেন। তিনি তখন খুব দুর্বল ও অসুস্থ ছিলেন।

হজরত হোসাইন (রা.) লোকদের সামনে আপন উচ্চ বংশ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে তাদের ধর্মানুভূতি জাগানোর চেষ্টা করে বললেন, তোমরা নিজ নিজ বিবেকের মুখোমুখি হয়ে আত্মজিজ্ঞাসা করো। আমি তো তোমাদের নবীকন্যার পুত্র।

আমার মতো মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ কি তোমাদের শোভা পায়? এরপর হুর ইবন ইয়াজিদ তার সঙ্গে যোগ দিলেন এবং লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন।

শিমার সর্বপ্রথম আক্রমণ শুরু করে আর হোসাইনের (রা.) সঙ্গিরা দু’জন দু’জন এবং একজন একজন করে তাদের প্রিয় ইমামের সামনে লড়াই করতে থাকে।

আর তিনি তাদের এই বলে দোয়া দিতে থাকেন, ‘আল্লাহ্ তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠ মুত্তাকীদের শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দান করুন।’ এভাবে লড়াই করতে করতে তারা শহিদ হয়ে গেলেন। (আবুল হাসান আলী নদভী,আলী মুরতাযা রা.,পৃ-২৫৪)

মূলত ইবন জিয়াদের বাহিনী হোসাইনের (রা.) চারপাশে আক্রমণ করছিল, কিন্তু তার ওপর আক্রমণ করার কেউ সাহস করছিল না।

শিমার তার যোদ্ধাদের হোসাইনের (রা.) ওপর আক্রমণ করার জন্য উত্তেজিত করে বলল, তাকে হত্যা করতে তোমাদের আর বাধা কোথায়?

তখন নরাধম যুরআ ইবন শরীক তামীমী আগে বেড়ে তার কাধে তরবারি দ্বারা আঘাত করলো, আতঃপর সিনান ইবন আনাস ইবন আমর নাখয়ী তাকে বর্শাঘাত করলো এবং ঘোড়া থেকে নেমে ইমাম হোসাইনের মাথা কেটে নিলো। আর তা খাওলার হাতে অর্পন করলো। (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)

জাফর ইবন মুহাম্মদ বলেন, নিহত হওয়ার সময় আমরা হোসাইনের শরীরে ৩৩ টি বর্শাঘাত এবং ৩৪ টি তরবারির আঘাত দেখতে পেয়েছি।

কারবালার যুদ্ধে হোসাইনের পক্ষে ৭২ জন শাহাদাতবরণ করেন। মুহাম্মাদ ইবন হানাফিয়া বলেন, হোসাইনের (রা.) সঙ্গে এমন ১৭ জন শহীদ হোন যারা সকলেই ছিলেন হজরত ফাতেমার (রা.) বংশধর।

ইমাম হোসাইন (রা.) ৬১ হিজরীর ১০ মুহররম, শুক্রবার শহীদ হোন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর ৬ মাস ১৫ দিন।

হজরত হোসাইনের (রা.) বিরুদ্ধে যারাই অস্ত্র ধারণ করেছে এবং তার হত্যায় যাদের ভূমিকা ছিল পরবর্তীতে তাদের সকলে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল।

আল মুখতার পথভ্রষ্ট হওয়া সত্ত্বেও হোসাইনের (রা.) ঘাতকদের খুঁজে খুঁজে বের করে হত্যা করে। অবশ্যই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী। (ইবন কাসীর,আল বিদায় ওয়ান নিহায়া, খ-৯,পৃ-১৮৮)

হোসাইনের (রা.) বিরুদ্ধে যারাই অস্ত্র ধারণ করেছে তাদের সকলেই জঘন্যভাবে নিহত হয়েছে, কেউ পাগল হয়ে গিয়েছে।

তাদের সবার আলোচনা ইবন কাসীর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়ার ৮ম খন্ডে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

ইবন জিয়াদ তাওয়াবিন নামে একটি দলের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়, তার মাথাও ছিন্ন করা হয় এবং হত্যার পর তার মাথার মধ্যে শাপ ঢুকে যায়। উমর ইবন সাআদও নিহত হয়।

ইবন হিশামের বর্ণনা মতে, হোসাইনের (রা.) ছিন্ন মস্তক যখন ইয়াজিদের দরবারে হাজির করা হলো তখন ইয়াজিদের দু’চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল। সে বলেছিলো, হোসাইনকে হত্যা করা ছাড়াও তোমাদের আনুগত্যে আমি সন্তুষ্ট হতাম। (প্রাগুক্ত,পৃ-১৯১)

মুয়াবিয়ার (রা.) জনৈক মুক্ত দাস বর্ণনা করেন, ইয়াজিদের সামনে যখন হোসাইনের ছিন্ন মস্তক রাখা হলো তখন আমি তাকে কাঁদতে দেখেছি এবং বলতে শুনেছি,ইবন জিয়াদ আর হোসাইনের মাঝে রক্তসম্পর্ক থাকলে সে এটা কখনো করতে পারতো না। (প্রাগুক্ত, পৃ১৭১)

বন্দিদেরকে ইয়াজিদের সামনে আনা হলে প্রথমে সে তাদের প্রতি রুক্ষ আচরণ করে। পরে আবার কোমল আচরণ প্রদর্শন করে তাদের নিজ হেরেমে পাঠিয়ে দেয়। অতঃপর তাদেরকে সসম্মানে মদীনা শরীফে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

ইয়াজিদ ওবায়দুল্লাহ ইবন জিয়াদকে তার কৃতকর্মের জন্য বরখাস্ত, সাজা বা কোনো তিরস্কারও করে নি। পক্ষান্তরে আনন্দ-উল্লাসের এমন কিছু বর্ণনা এসেছে যা কোন মুসলিমের পক্ষে শোভনীয় নয়। (আবুল হাসান আলী নদভী, আলী মুরতাযা রা.,পৃ-২৫৫)

রাজত্বভোগ করতে ইয়াজিদ মাত্র চার বছরের বেশী বেঁচে ছিল না। ৩৪ হিজরীতে কারবালা ও হাররার মর্মন্তুদ ঘটনার দায়ভার নিয়ে মৃত্যু মুখে পতিত হয়।

তার মৃত্যুর দ্বারা আবু সুফিয়ানের পরিবারের রাজত্বের অবসান হয়। সকল রাজত্বের একচ্ছত্র মালিক একমাত্র আল্লাহ, তিনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন।

লেখক: শিক্ষক,মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ

Comments are closed.