না বলা কথা, না বলা ব্যথা

কক্সবাজার পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক আবু নাঈম মাসুম সম্প্রতি বদলি হয়েছেন অন্যত্র। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি তার ফেসবুকে বিভিন্ন দিক নিয়ে  মতামত ব্যক্ত করেন তা হুবহু তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য।

বাংলা সিনেমার সচরাচর একটি দৃশ্য দেখবেন — নায়ক বেশী ভদ্র হলে সে সবার জন্য চুপিসারে উপকার করে কিন্ত সবাই তারে ভুল বুঝে বেদম মারে। অবশেষে, সবাইকে নিজেই কাঁদতে কাঁদতে জানায় কার জন্য কী করেছে।

সাড়ে তিন বছর কক্সবাজারবাসীকে সেবা দিয়েছি। আমার লক্ষ্য ছিলো কেউ যেন আমার ব্যবহারে কষ্ট না পায়। আমি কোনদিন ৯.০০ টা ৫.০০ টা অফিস করি নি। রাত ১০ টায় ও বাসায় গেছি সব কাজ শেষ করে যদিও ২/১ জন ষ্টাফ আমাকে সে অবধি সহযোগিতা করেছে। বিনিময়ে কোন আবেদনকারী ভালোবেসে এক কাপ চা ও খাওয়ায় নি। কেঊ খবর ও রাখে নি।

কত শুক্রবার / শনিবার আমার স্টাফদের সকালে ডেকে সার্ভার চালু করে ছুটির দিনেও পাসপোর্ট দিয়েছি তা ওই ব্যক্তি আর আল্লাহ ছাড়া কেউ স্বাক্ষী নাই।

কত দুপুর সেবা দিতে দিতে পার হয়েছে যে দুপুরের খাবারটাও ঠান্ডা হয়ে গেছে তা কোন আবেদনকারী খবর ও রাখে নি। সে খবর রেখেছে ভার্তৃতুল্য জাহাঙ্গীর, যে খাবার রেডি করে রাখতো। আমার দুয়ারে ফকির এসে ভিক্ষা নিয়ে যায় আর আবেদনকারী তো নিজের ঘর মনে করে আসতো, যেতো। নিন্দুক কি আর সে খবর রাখে?

কতো জনের পুলিশ রিপোর্ট দিনে দিনে ডি. আই. ও Ali Arshad ভাইকে বলে সম্পন্ন করিয়েছি তা কেবল তারাই জানেন। কতো অচেনা কক্সবাজারবাসীকে শুধু মুখের চেনা চিনেই তাদের ফাইল নিজে লিখে সত্যয়ন করে দিয়েছি তা আল্লাহ জানেন।

পাসপোর্ট করতে আসা রোহিঙ্গা আটক করে জেলে পাঠানো হয়।

একরাশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জেলায় রাতদিন সেবাদিয়ে কতবার যে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেছি তা আমার প্রিয় ডাক্তার বন্ধুরা ভালো জানেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না। কাজের চাপে আমি যে কোনদিনই সেন্টমার্টিন যাই নি তা হয়তো কেউই জানে না। ধ্যানজ্ঞান ছিল কক্সবাজারবাসীদের আবারিত সেবা দান।

কোন বাপের ব্যাটা বলতে পারবে না পাসপোর্ট করার জন্য আমাকে উপরি টাকা দিয়েছে। বরং দালাল চক্রের হাত ধরে যারাই এসেছে তাদের আবেদন জব্দ করে বিভিন্ন অংকের টাকা দান করিয়ে জরিমানা / নিজ নিজ বাড়িতে সীমানায় ১০/২০ টা গাছ লাগিয়ে ( জরিমানা হিসাবে) প্রমাণ দেয়া সাপেক্ষে আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। না হলেও ৩০০০ এর উপর গাছ লাগানো আর দান হিসাবে যে কত টাকা জরিমানা করা হয়েছে তা স্লীপ না দেখে বলা দুষ্কর।

রোহিঙ্গা পাসপোর্ট পাওয়া তো দুরের কথা ধরা মাত্রই সহযোগী শ জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।উপরন্তু, এই সাড়ে তিন বছর সময়কালে কোন রোহিঙ্গা পাসপোর্ট পায় নি ; একজন ও না যদিও এখানে ১২ লাখের বেশী রোহিঙ্গাদের বাস। বিশ্বাস না হলে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। স্বভাবতই ছুটা দালাল /প্রফেশনাল দালাল / মৌসুমী দালাল সবার রিজিকে সমস্যা হলো। ফলে দালালরা উঠে পড়ে লাগলো। দুঃখ জনক বিষয় হলো তার সাথে কিছু সংবাদকর্মী ও তাদের সাথে সুর মেলালো।

কেউ কেউ আমার ব্যবহার নিয়ে কটু মন্তব্য করেছেন। যারা সুবিধা পান নি তারা ও। আমার কথা হলো ১২/১৫ লক্ষ রোহিঙ্গাদের ভীড়ে সেবা দিতে দিতে সব সময় তো আর মুখে শাবনুরের হাসি থাকে না। আর প্রিয় নবী মুহাম্মদ( সাঃ) যার আগে পরে কোন পাপ নাই তার ও তো শত্রু ছিল সেখানে আমি তো তুচ্ছতম। আর মেনে নিয়েছি, কেননা শুধু মরা লাশের কোন শত্রু থাকে না। আল হামদুলিল্লাহ সে তুলনায় আমার নিন্দুক অনেক কম।

আফসোস আমার কর্মকালীন সময়ে কোন রোহিঙ্গা আমায় আঘাত করলো না সেখানে কিছু সুবিধা বঞ্চিত দেশী ভাইরা আমায় মনঃযাতনা দিলো।

আমার পোষা কুকুরকে বললাম, “আমি চলে যাবো, আয় শেষবারের মতো সবাই মিলে একটা গ্রুপ ছবি তুলি, আয় সামনে তাকা “। দেখুন আমার কথা মত কী সুন্দর ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পোজ দিল!!!
আফসোস!!! কুকুর কথা বুঝলো কিন্তু কিছু লোক আমায় বুঝলো না। আমার বিদায়কালে আমার বন্ধু,শত্রু সবারইকে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞা জানাই। যদি কাউকে অজান্তে কষ্ট দিয়ে থাকি তবে বিনয়ের সাথে ক্ষমাপ্রার্থী, কিন্ত নিন্দুক ভাইদের বলবো—

“আমি তো ভালা না, ভালা লইয়া থাইকো…… 😁”

বিদায় প্রিয় ককক্সবাজারবাসী।।।

আবু নাঈম মাসুম

সহকারী পরিচালক

কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস।

Comments are closed.