গায়েবি মামলা, আটক ও রিমান্ড ফৌজদারি ও মানবতাবিরোধী অপরাধ

আহমদ হাসান

ক্ষমতাসীনদের দায়ের করা মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে প্রতিপক্ষদের হয়রানি-নাজেহাল করার রেওয়াজ এই দেশে সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই চলে আসছে। এ লক্ষ্যে প্রধানত যে আইন তিনটি অপব্যবহার করা হতো তা হলো; ০১. দণ্ডবিধি আইন ১৮৬০; ০২. সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ এবং ৩. ফৌজদারি কার্যবিধি আইন ১৮৯৮। অবশ্য সাধারণ জনগণকে, বিশেষ করে ব্রিটিশরাজের খাজনা-পাতি নিয়মিত দিতে না পারা তথা তাদের আপত্তি-বিদ্রোহ দমনের লক্ষ্যেই তারও আগে, ১৮৫৫ সালের সিপাহি ‘বিপ্লব’র প্রেক্ষাপটে সৃষ্টি করা হয়েছিল পুলিশবাহিনী, পুলিশ আইন ১৮৬১ প্রণয়নের মাধ্যমে।

তখন থেকে এ পর্যন্ত যে সব নিত্যনতুন আইন আমরা দেখছি, সেগুলোকে বলা যায় উপরোল্লিখিত আইন চারটিরই ‘বাই-প্রোডাক্ট’। তবে লক্ষণীয়, সেই সময়কার হয়রানি-নাজেহালমূলক মামলা-মোকদ্দমার ঘটনা বিবরণগুলোর মধ্যে কিছুটা সত্যতা থাকত, যা অতিরঞ্জনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানো হতো। আর নাজেহালের কাজটি তদন্ত-গ্রেফতার-রিমান্ড ইত্যাদির মাধ্যমে পুলিশ সম্পাদন করলেও সাধারণত সেই অতিরঞ্জন বিবরণের বাদী হতো সাধারণ মানুষদের মধ্যে থেকেই কোনো একজন। বোধ করি সে কারণেই এমন অতিরঞ্জনের ক্ষেত্রে, তা সৃষ্টিকারীর বিরুদ্ধে আইনগত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা [দেখুন দণ্ডবিধি ধারা-২১১] গ্রহণের ক্ষমতা দিয়ে রাখা হয়েছিল পুলিশ রিপোর্টের ভিত্তিতে একমাত্র সেই আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর, যে পুলিশ তথা আদালতের বিচারকেরাও ছিলেন ব্রিটিশ শাসকদের একান্ত বাধ্য-অনুগত। তাই খুব ব্যতিক্রম বাদে এরা ব্রিটিশরাজের প্রতিকূলে যায় এমন ব্যবস্থা বা সিদ্ধান্ত নিজে থেকে [স্যুয়োমটো] খুব কমই নিতেন।

এরপর ১৯৪৭ সালে আমরা প্রথম ব্রিটিশ থেকে স্বাধীন হই। অতঃপর ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানিদের থেকেও। এরপর ১৯৯১ সাল থেকে দেশে জনপ্রত্যাশা প্রতিফলনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া শুরু করে। যার ধারাবাহিকতা ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিতর্কহীনভাবে বলবৎ থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এই যে, শাসকশ্রেণীর জন্য অনুকূল ব্রিটিশরাজের সেই আইন সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের জন্য উপযোগী করে পুনঃপ্রণয়ন করার গরজ এই সময়ের কোনো শাসকই দেখাননি।

শিক্ষণীয় বিষয় হলো, সম্ভবত রাষ্ট্রীয় কাঠামো মজবুত রাখার লক্ষ্যেই এই অপকর্ম-কুকর্মগুলোতে ব্রিটিশরাজ তার কর্মচারীদের প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত না করে পরোক্ষভাবে কাজে লাগাত। অজ্ঞতা তথা লোভের বশবর্তী হয়ে সরকারি কর্মচারীরা [এ ক্ষেত্রে পড়ুন পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট] অতি আগ্রহী হয়ে নিজে থেকেই এমন অপরাধ কর্মের সাথে জড়িত হয়ে না পড়ে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট আইনে তারা ‘বিশেষ কিছু ধারা’ স্থাপন করে। যথাযথ প্রশিক্ষণ তথা সেই ধারাগুলোতে উল্লিখিত শাস্তি ভীতি ইত্যাদি, কারণ যাই-ই হোক না কেন, সরকারি কর্মচারীরা, খুব ব্যতিক্রম বাদে, এমন অপরাধ কর্মে জড়িত হয়েছেন এমনটি ২০০৯ সাল পর্যন্ত খুব একটা দেখা যায়নি। সরকারি কর্মচারীদের জন্য সেই ‘বিশেষ ধারাগুলো’ নিয়েই আজকের এই লেখা।

দুই.
ডিসেম্বর ’১৩ থেকে টুকটাক শুরু হলেও গত চার মাস, বিশেষ করে ০১ সেপ্টেম্বর ’১৮ তারিখে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পর থেকে ঘটনাই ঘটেনি এমন ক্ষেত্রেও নাশকতার ঘটনা দেখিয়ে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে চার সহস্রাধিক। যাতে আসামি করা হয়েছে প্রায় তিন লক্ষাধিক বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের। অতঃপর সেই মিথ্যা মামলায় তাদের আটক করে রিমান্ডের নামে নির্যাতন চালানো হচ্ছে মর্মে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে ৭ অক্টোবর ’১৮ প্রকাশিত একটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে ‘হঠাৎ কেন এত গায়েবি মামলা’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়- ক. কোনো ঘটনাই ঘটেনি, তার পরও কল্পিত ঘটনায় পুলিশ মামলা করেছে। যা গায়েবি মামলা বলে পরিচিতি পেয়েছে। মামলায় আসামি তিন লাখ ৬০ হাজার। গ্রেফতার চার হাজার ৬০০। খ. পুলিশ সদরের নির্দেশনার ভিত্তিতে আসামি করা হচ্ছে। পুলিশ সদরের দু’জন ডিআইজি এই পরিকল্পনা প্রস্তুত করে জেলা পুলিশ সুপার, পুলিশ কমিশনারদের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করে চলেছেন। গ. লক্ষ্য আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীর সম্ভাব্য এজেন্ট এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার সক্ষমতাসম্পন্ন নেতাকর্মীদের শনাক্ত করে এই মামলার আওতায় আনতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ কারণে কারাগারে থাকা, হজে থাকা, বিদেশে থাকা, গুরুতর অসুস্থ হয়ে চলাফেরা অক্ষম, এমনকি মৃত ব্যক্তিরাও আসামি হয়ে গেছেন।

তিন.
শুরুতেই উপরোল্লিখিত বিষয়াবলির ক্ষেত্রে আইন ও বিধি কী বলে খুব সংক্ষেপে তা দেখে নেয়া যাক। উল্লেখ্য, এই আইনগুলো http://bdlaws.minlaw.gov.bd/ এই ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।
ক. সাধারণ ব্যক্তির মাধ্যমে মামলা রুজুর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, কোনো এলাকায় কোনো ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হলে যেকোনো ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট থানায় সেই বিষয়ে মামলা [এজাহার] দায়ের করতে পারেন। [ফৌ:কা: ধারা-১৫৪।]

তবে কু-মতলবে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত, নাজেহাল করার উদ্দেশ্য নিয়ে যদি মিথ্যা তথ্য [অতিরঞ্জন নয়] দিয়ে কেউ এমন এজাহার দায়ের করে, তাহলে সে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে যায়। যার শাস্তি ক্ষেত্রভেদে যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্তও হতে পারে। [দণ্ডবিধি ধারা-১৭৭, ১৮২, ১৯৩-১৯৫, ২১১]।

খ. আর পুলিশের মাধ্যমে মামলা রুজুর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, কোনো অপরাধজনক ঘটনা সম্পর্কিত কোনো তথ্য গুজব, জনশ্রুতি অথবা টেলিফোনে থানা পুলিশ পেল, তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমেই এজাহার দায়ের না করে তা জেনারেল ডায়েরিতে [জিডি] লিপিবদ্ধ করে সরেজমিন আগে তার সত্যতা পরীক্ষা করতে হবে। অতঃপর তথ্যটি ভিত্তিমূলক বা সত্য বলে প্রতীয়মান হওয়ার পর যদি সেই তথ্যদাতাকে খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে থানার যেকোনো কর্মকর্তা নিজেই বাদী হয়ে সেই বিষয়ে মামলা রুজু করতে পারেন। [পিআরবি ধারা-২৪৩(ঘ); এবং ডিএমপি রুলস: অধ্যায়-থানা, ধারা-৫৭(৭)]।

পুলিশের এ ধরনের গায়েবি মামলা রুজুই যেখানে তাদের অপরাধমূলক কর্ম, সুতরাং সেই মামলায় কাউকে গ্রেফতার করাটাও অবশ্যই আরেকটি অপরাধ। যার শাস্তির পরিমাণও ক্ষেত্রভেদে একেক রকম। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাগুলো, যা পালন করা প্রত্যেকের জন্যই বাধ্যতামূলক, হলো-
১. যথাযথ কারণ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে হয়রানিমূলক গ্রেফতার করা হলে গ্রেফতারকারী পুলিশ অন্যায় আটকের [Wrongful confinement] অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে যায়। যার কারাদণ্ডের মেয়াদও ক্ষেত্রভেদে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। [দণ্ডবিধি ধারা-৩৪০-৩৪৪; AIR 1924 Bom 333 = 25 Cri L Jour 797 (DB)].

২. হয়রানিমূলক আটক বলতে বুঝাবে যৌক্তিক এবং আইনানুগ ক্ষমতা ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করা। সুতরাং, এরূপ কোনো হয়রানিমূলক গ্রেফতারের জন্য গ্রেফতারকারী পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ধারা-২২০ মোতাবেকও অভিযোগ আনয়ন করা যায়। [PLD 1946 Dacca 618 = 16 DLR 38 = PLR 1963 Dacca 1509]. [AIR 1948 Sind 67 = 49 Cri L Jour 178 (DB)].

৩. যৌক্তিক কারণ এবং নির্ভেজাল বিশ্বাস ছাড়া কোনো পুলিশ অফিসার যখন কোনো ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে অথবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে গ্রেফতার করে তখন সে নিজেকে ধারা দণ্ডবিধি ধারা-২২০ এর অধীনে প্রসিকিউটঅ্যাবল করে ফেলে। [Md Yusuf Ali Vs The State 22 DLR BLD (HCD)23].

৪. যেকোনো ধরনের হয়রানিমূলক আটকই অবৈধ। সুতরাং অবৈধ আটক কোনো ব্যক্তিকে আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে পুলিশ হেফাজত হেখে উদ্ধার করা কোনো অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে না। [13 Cri L Jour 590 (DB) + 1898 Pun Re No.12 Cr P 29].

চার.
ওপরে দেয়া ব্যাখ্যা-বিবৃতি থেকে স্পষ্টভাবেই অনুধাবন করা যায়, কোনো ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেফতারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণ যৌক্তিক কারণ এবং নির্ভেজাল বিশ্বাস থাকতে হয়। মন চাইলেই আর ইচ্ছা হলেই কাউকে আটক করা যায় না। অন্যায়ভাবে আটক করে থানায় এনে পরে মুক্তি দেয়া হলে তা দণ্ড-৩৪২ এর অপরাধ, আর প্রসিকিউট করে কোর্টে পাঠানো হলেই তা দণ্ড-২২০ এর অপরাধ হয়ে যায়।
এরপর বিজ্ঞ আদালত যদি যথাযথভাবে তা যাচাই-বাছাই না করেই গতানুগতিক রিমান্ড আদেশ দিয়ে দেন তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সেই ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে দণ্ড-২১৯ এর অনুসরণে অভিযোগও আনয়ন করতে পারেন।
কেননা দণ্ডবিধি ধারা-২১৯ : এ বলা হয়েছে, যে সরকারি কর্মচারী [পড়ৃন ম্যাজিস্ট্রেট] বিচার বিভাগীয় মামলার যেকোনো পর্যায়ে অসাধুভাবে বা বিদ্বেষাত্মকভাবে এমন কোনো আদেশ, রায় বা সিদ্ধান্ত প্রদান করে, যাহা সে আইনের পরিপন্থী বলে জানে, তা হলে সেই সরকারি কর্মচারী এই ধারায় অপরাধী বলে গণ্য হয়। যার শাস্তি সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।

গ্রেফতার আসামিকে জামিন বা রিমান্ড দেয়ার ক্ষেত্রে তো বটেই তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার গৃহীত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হচ্ছে বা হয়েছে কি না, তা দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার মূল দায়িত্ব প্রথমত, মামলাটির তদন্ত তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের, অতঃপর নি¤œ আদালতের সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা জজের। সেটাও কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মাথায় রাখতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে হতে পারে সমূহ আইনি বিপদ!

কেননা ফৌ:কা: ধারা-১৬৭ মোতাবেক রিমান্ড আদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাগুলো হলো, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত করা না গেলে- ০১. আসামিকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানোর সময় কেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত করা গেল না সেই বিষয়টি তদন্তকারী অফিসার সুস্পষ্টভাবে তার ফরোয়ার্ডিংয়ে উল্লেখ করবেন। [৫৫ উখজ ৩৬৩];
০২. রিমান্ড মঞ্জুরের আগে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট অবশ্যই পুলিশের কেস ডায়েরি এবং গ্রেফতার করা আসামির বিরুদ্ধে আনীত অপরাধের অভিযোগের প্রাথমিক সাক্ষ্য-প্রমাণ, যৌক্তিকতা ইত্যাদি পর্যালোচনা করবেন। অতঃপর নিজে সন্তুষ্ট হলে রিমান্ড মঞ্জুর করবেন। [State vs Wazir Khan 20 DLR (WP) 264]

০৩. রিমান্ড মঞ্জুর সংশ্লিষ্ট আসামির সম্মুখে (তার বক্তব্য শ্রবণের পর, তা আমলে নিয়ে) করতে হবে; [ঝধরভুুঁধসধহ াং ঝঃধঃব ৫৬ উখজ ৩২৪]. আর বহুলালোচিত আইন International Crime (Tribunal) অপঃ, ১৯৭৩, যেখানে অপরাধের শাস্তি হিসেবে শুধু বিধান রাখা হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নতুবা মৃত্যুদণ্ডের। সেই আইনের ঝবপ-৩(২)(ধ) ধারায় ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- … Iimprisonment, abduction, confinement, torture…, or other inhumane acts committed against any civilian population… on political… grounds, is known as‘Crimes against Humanity’.

লেখক : ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ

Comments are closed.