এখন ছাগল গাছেও উঠে!

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের নতুন বই নিয়ে চারদিকে শোরগোল হচ্ছে। কোমলমতি শিশুদের এই বইয়ে নানা ভুল, তথ্যবিভ্রাট আর অসংগতি এই শোরগোলের কারণ। দৃশ্যত: এগুলো অনিচ্ছাকৃত নয় বলেই মনে হচ্ছে। ভুলের ধরণ দেখেই এটা আন্দাজ করা যায়। এই যেমন, প্রথম শ্রেণীর বইতে ১২ নম্বর পৃষ্ঠাতে শুনি ও বলি’তে ”ও” নিয়ে শিশুদের ফেলা হয়েছে বিব্রতকর অবস্থায়। সেখানে ‘ও’-তে ‘ওড়না চাই’ শিশুদের ওড়নার এই শিক্ষা কি কাজে লাগবে? এটা কারোরই মাথায় আসছে না। উপরন্তু ওড়নার ব্যবহারের অজ্ঞতার কারণে শিশুর জীবনঝুঁকিও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

ঠিক একইভাবে ছাগলকে গাছেও তুলে দেয়া হয়েছে একটি বইতে। ছাগলকে যদি গাছে তুলে দেয়া হয়, সেই বই পড়ে আজকের শিশুরা পর্যায়ক্রমে উচ্চশিক্ষার কোনস্তরে গিয়ে উঠবে! বরাবরের মতো এবারও কবিতার বিকৃতি ঘটিয়ে দেয়া হয়েছে। কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’তে ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’কে বদলে দিয়ে ছাপানো হয়েছে, ‘আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে!’

তৃতীয় শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের প্রচ্ছদ উল্টো করে দেয়া অবস্থায় পাওয়া গেছে কোথাও কোথাও। শিশুরা এই উল্টা বই নিয়ে বাসা-বাড়িতে কান্নাকাটি করছে। পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে ‘ঘোষণা’ বানান ‘ঘোষনা’, ‘সমুদ্র’ বানান ‘সমুদ’ ছাপা হয়েছে।

নিখাদ সাহিত্য ও ভাষা শিক্ষার বইয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে তুলে আনা হয়েছে একেবারে ধর্মীয় বিষয়। বাদ পড়েছে ধর্মনিরপেক্ষ লেখকদের লেখা। নতুন শিক্ষানীতির আলোকে তৈরি কারিকুলামের ভিত্তিতে নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের তিন বছরের মাথায় এবার আবার বড় ধরনের পরিবর্তন হলো। শিক্ষাব্যবস্থা এবং এখাতে এই তুঘলকি কারবার নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা থাকলেও বরাবরের মতো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং কর্তৃপক্ষ কোনো গা করছেন না। দৃশ্যত মনে হচ্ছে, ‘কারো যেন কিছুই বলার নেই।’

১ জানুয়ারি নতুন বই বিলি করার পর থেকেই এসব বিব্রতকর ভুল নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল ঝড় বইছে। বইয়ের যাচ্ছেতাই এসব ভুল, অপ্রাসঙ্গিক নানা বিষয়, যা নিয়ে সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন ফোরামে তুমুল বিতর্ক থামছে না। ছড়াকার মাহবুবুল আলম কবীর ফেসবুকে তার এক স্ট্যাটাসে যেমন লিখেছেন, ‘পড়লে ঠেলায় চড়বে ছাগল/ইউক্যালিপটাস গাছে–/কার কী বলার আছে?’

প্রশান্ত কুমার নামে একজন ক্ষোভ নিয়ে লিখেছেন, ‘ছাগল গাছে উঠে আম খাচ্ছে!’ প্রথম শ্রেণির বইয়ে এ লেখা ও ছবি দেখে মনে হচ্ছে শিক্ষার মান বেড়েছে বলেই ছাগল গাছে উঠতে পেরেছে। কোন জাতের লেখাপড়া জানা লোকজন এ জাতের বই প্রণয়ন করে?’

প্রথম শ্রেণিতে যখন ‘ছাগল গাছে উঠে আম খাচ্ছে’ তখন অষ্টম শ্রেণির আনন্দ পাঠে বিদেশি গল্পের অনুবাদ। তাও আবার বানান ভুলে ভরা। এসবই নতুন ২০১৭ শিক্ষাবর্ষের বোর্ডের পাঠ্যবইয়ের নমুনা। নতুন পাঠ্যবইয়ের এমন নানা ভুল চোখে পড়েছে অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদেরও। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা তুলে ধরতেও দেরি করছেন না তারা। ভুলের সঙ্গে ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে দিচ্ছেন নিজের মতও। এ ছাড়া আসলে তাদের করার কিছুই নেই। দেশের ভবিষ্যত নাগরিকদের শিক্ষার বইয়ের মতো স্পর্শকাতর এবং অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এরকম অসংখ্য অসংগতি, বানান ভুল, তথ্যবিভ্রাট শিক্ষামন্ত্রনালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

এবারের বই উৎসবে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত দেশের কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে বোর্ডের নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হয়। এ বছর ৪ কোটি ২৬ লাখ শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীর জন্য ৩৬ কোটির বেশি পাঠ্যবই ছাপানো হয়েছে। এই শিশুশিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, দেশে এতো শিশুশিক্ষার্থী আদৌ আছে কি?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, শিক্ষাক্রম নতুন করে সংশোধন ও পরিমার্জন করার পর ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রথম শ্রেণিতে বাংলা পাঠ্যবইটির ১১ পাতায় অ-তে অজ (ছাগল) বোঝাতে গিয়ে এই ছবিটি আছে। আমরাও এটি পড়িয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ছবিটি ভুল। কারণ ছাগল গাছে উঠে আম খায় না। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। বোর্ড থেকে যেভাবে দেবে সেভাবেই আমরা শিক্ষকরা পড়াই। এটি পান্ডুলিপি যারা তৈরি করেছেন তাদের যেমন ভুল, তেমনি যারা পাণ্ডুলিপিটি পরীক্ষা ও নিরীক্ষা করেছেন তাদেরও ভুল। নিরীক্ষকরা পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি পড়ে দেখেন বলে মনে হয় না। যার কারণে পাঠ্যবইয়ে অনেক ভুল থাকে। এই বই তৈরির পেছনে সরকারের অনেক অর্থ অপচয় হয়।

হাবিবুর রহমান নামে একজন অষ্টম শ্রেণির আনন্দপাঠ বইটির প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র তুলে ধরে ফেসবুকে লিখেছেন,‘খালি বিদেশি টিভি সিরিয়ালেই সমস্যা! এই যে বইটি,অষ্টম শ্রেণির আনন্দপাঠ। এখানে সবগুলো গল্প বিদেশি গল্প থেকে অনূদিত। এসবের জন্য কি কোনো প্রতিবাদ হবে!!!’

আনন্দপাঠ বইটির সূচিপত্রে দেওয়া সাতটি গল্পের সবগুলোই বিদেশি লেখকদের গল্প, উপন্যাস অবলম্বনে লেখা বা ভাষাগত রূপান্তর করা হয়েছে। গল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে-আরব্য উপন্যাস অবলম্বনে ‘কিশোর কাজী’,মার্ক টোয়েনের ‘রাজকুমার ও ভিখারির ছেলে’, ড্যানিয়েল ডিফোর ‘রবিনসন ক্রুশো’, ফরাসি উপন্যাসিক মহাকবি আবুল কাশেম ফেরদৌসীর ‘সোহরাব রোস্তম’, উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’, ওয়াশিংটন আরবি রচিত গল্প অবলম্বনে ‘রিপভ্যান উইংকল’ এবং লেভ তলস্তয়ের ‘সাড়ে তিন হাত জমি’।

পূণশ্চ:

সম্প্রতি প্রাথমিকের বই পড়ে এক অভিভাবক নিদারুন ভাবনায় পড়লেন। তিনি জানতেন এই যুগে অভিভাবকের কাজই হল অভিভাবনা-অতিভাবনা। তো তিনি ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত গেলেন এক মনস্তাত্বিকের কাছে। গিয়ে খুলে বললেন সব কথা।

সব শুনে সাইক্রিয়াটিস্ট বললেন, ‘ছাগল কখনো আম খায় না। এটা তার খাবার কথাও না। আবার ছাগল গাছের গোড়ার কিছু অংশ উঠতে পারলেও একেবারে গাছে উঠে পড়ার মতো যোগ্য সে নয়। ফলে বাক্যটি মারাত্মক ভুলে ভ্রষ্ট। প্রাথমিকের মতো কোমলমতি শিশুদের বইয়ে এটা হওয়া সঠিক হয়নি।’

‘আসলে বাক্যটি এরকম হলে ভাল হতো,‘বলেই থামলেন কিছুক্ষণ।

অভিভাবক শুধালেন, ‘কেমন বাক্য?’

‘আসলে হওয়ার কথা ছিল,’ ”ছাগল আকাশে উড়ে।”

[উল্লেখ্য, এই সাইক্রিয়াটিস্ট নিজেও তার শিশু সন্তানের ভুলেভরা বইপত্র কয়েকদিন ধরে নাড়াচাড়া করে নিজেও মস্তিস্কবিকৃতিতে ভুগছিলেন।]

শেষকথা:

ক্লাশ পাস করানো মানেই শিক্ষিত করানো নয়। ভুলেভরা বই পড়িয়ে শিশুদের জোর করে ‘ছাগলকে গাছে তোলার মতো করে’ শতভাগ পাস করানো যেতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই শিক্ষিত করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা খুব শিগগিরই এ সত্য  বুঝতে পারলেই মঙ্গল।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। বার্তা সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

Comments are closed.