ওহুদ যুদ্ধের কিছু ঈমানদীপ্ত কাহিনী

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ ওহুদ যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে এক জটিল ঘটনা। রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তের মাঝে এই ওহুদ যুদ্ধ একটি। সীরাতে ইবনে হিশাম থেকে শুরু করে সকল প্রাচীন সীরাত ও হাদীসের গ্রন্থগুলিতে ওহুদ যুদ্ধের কাহিনী খুব গুরুত্ব সহকারে বর্ণিত আছে। আমি এখানে সীরাতে ইবনে হিসাম ও আল্লামা ইদ্রীস কান্ধলভী রহ এর লেখা সীরাতুল মোস্তফা সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে ওহুদ যুদ্ধের কিছু ঘটনা তুলে ধরার চেষ্টা করব।

 

ওহুদ যুদ্ধের প্রথমে মুসলমানদের জয় হয়েছিল। কিন্তু তীরন্দাজরা যখন ভাবেন যে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে তাই তাদের নির্ধারিত জায়গা ছেড়ে দিয়ে যুদ্ধের ময়দান পরিত্যাগ করা শুরু করলেন তখন কাফেররা পাল্টা আক্রমণ করে। এমনকি কাফেররা রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সরাসরি তলোয়ার হাতে নিয়ে যুদ্ধ করার অনুমতি ছিল না।

 

ওহী দ্বারা উনাকে অনেক আগেই এটা নিষেধ করা ছিল। এবং কোন জিহাদেও রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তলোয়ার হাতে নেননি। কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন শুধু রহমতের প্রতীক। যাই হোক তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কে আছ যে কাফেরদেরকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দিবে এবং জান্নাতে আমার বন্ধু হবে? তখন ৭ জন আনসার সাহাবী রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলেন। একে একে তাঁদের ৭ জনই শহীদ হয়ে যান। সাহাবী সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রাঃ এর কাফের ভাই উতবা ইবনে আবু ওয়াক্কাস সুযোগ বুঝে রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করে।

 

 

এতে রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিচের দাঁতের পাটি পড়ে যায় এবং ঠোঁট থেকে রক্ত পড়া শুরু করে। তখন সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রাঃ বলেন, তখন আমি আমার আপন ভাইকে হত্যা করার জন্য যতটা আগ্রহী ও উৎসাহী হয়ে পড়ি জীবনে আর কখন কাঊকে হত্যা করার জন্য এতটা আগ্রহী বা উৎসাহিত হইনি। কুরায়েশদের পাথরের আঘাতে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখমণ্ডল থেকে রক্ত পড়তে থাকে তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছিলেন, হে আল্লাহ আমার কওমকে ক্ষমা কর কেননা তারা জানে না।

 

সাহাবী মালিক ইবনে সিনান রাঃ নিজের মুখ দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমস্ত রক্ত চুষে উনার মুখমণ্ডল পরিষ্কার করে দেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, তোমাকে জাহান্নামের আগুন কখনই স্পর্শ করবে না।

 

কুরাইয়েশদের বিখ্যাত পালোয়ান ইবনে কুমাইয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এত জোরে আঘাত করে যে বর্মের ২ টি লৌহ খণ্ড উনার মাথার ভিতর ঢুকে যায়। হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মুখ থেকে লৌহদণ্ড গুলি বের করতে গিয়ে উনার নিজের দাঁত দিয়ে ধরে কামড়ে টান দেন এতে ঐ সাহাবীর ২ টা দাঁত ভেঙ্গে যায়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাকে হাস্যোজ্জ্বল দাঁত দিয়ে পুনরুত্থিত করবেন।

 

যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাহাড়ের উপর উঠতে মনস্থ করলেন কিন্তু নিজের শারীরিক দুর্বলতার জন্য পাহাড়ের উপর উঠতে পারছিলেন না তখন তালহা রাঃ বসে পড়েন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পিঠে পা রেখে আরোহন করেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তালহা নিজের জন্য জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে।

 

কাফেরদের আক্রমণ প্রতিহত করার সময় তালহা রাঃ হাতের সব আঙ্গুল গুলি কেটে যায় তখন তিনি অবলীলায় বলে উঠেন হাসান বা উত্তম হয়েছে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তালহাকে বলেন, তুমি যদি তখন হাসান না বলে বিসমিল্লাহ বলতে তাহলে ফেরেশতারা তোমাকে উঠিয়ে নিয়ে যেত এবং কাফেররা তোমার দিকে তাকিয়ে থাকত। এমনকি ফেরেশতারা তোমাকে নিয়ে আসমানে প্রবেশ করত।

 

কায়স ইবনে হাযম রাঃ বলেন আমি তালহার ঐ হাত দেখেছি যা দিয়ে সে ওহুদ যুদ্ধে কাফেরদের আক্রমণ প্রতিহত করেছে, তা ছিল সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত। হযরত আবু বকর রাঃ বলেন, ওহুদ যুদ্ধের দিন তালহার শরীরে ৭০টির বেশি আমরা জখম পেয়েছি। ওই দিনের পুরাটাই ছিল তালহার জন্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহুদ যুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠলেই বলতেন যে ব্যক্তি শহীদকে জীবিত অবস্থায় পৃথিবীতে চলাফেরা করতে দেখতে চায় সে যেন তালহাকে দেখে। কাফেররা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি বৃষ্টির মত তীর ছোড়া শুরু করে তখন সাহাবী আবু দুজানা রাঃ মানব বর্ম হিসেবে রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন।

 

কিন্তু এই চরম মুহূর্তেও ঐ সাহাবী রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি বেয়াদবি হবে ভেবে উনার পিঠ রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখের সামনে না এনে উনার মুখ রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে রাখেন আর উনার পিঠ কাফেরদের সামনে দিয়ে কাফেরদের তীর ও বর্শার আঘাত সহ্য করে যাচ্ছিলেন।

 

সুবহানাল্লাহ দেখুন সাহাবীরা রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সম্মানের প্রতি কিরকম লক্ষ্য রাখতেন। কাফেরদের তীর ও বর্শার আঘাতে সাহাবী আবু দুজানার পিঠ চালুনির মত হয়ে যায়। উনি ঐখানেই শহীদ হয়ে যান। ঠিক এরকম ভাবে সাহাবী কাতাদা ইবনে নুমান রাঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রক্ষা করতে গিয়ে তার চোখে কাফেরদের তীর পড়ে উনার চোখের মনি বের হয়ে আসে। ঐ চোখের মনি সাহাবী কাতাদা রাঃ নিজ হাতে ধরে রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে নিয়ে আসেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চোখের মনিটিকে চোখের যথাস্থানে রেখে দিলেন। তৎক্ষণাৎ কাতাদা রাঃ এর চোখ আগের চেয়েও সম্পুর্ণ সুস্থ ও জ্যোতির্ময় হয়ে উঠে।

 

হযরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রাঃ ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ। উহুদের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক এক টি তীর সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রাঃ এর হাতে তুলে দিতে থাকেন আর বলেন তোমার প্রতি আমার পিতা মাতা উৎসর্গ হোক। হযরত আলী রাঃ বলেন সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস ছাড়া আর কারো জন্য আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার পিতামাতাকে উৎসর্গ করতে শুনিনি।

Comments are closed.