আজ পবিত্র হজ

খলিল চৌধুরী, সৌদি আরব#
পাপমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনা নিয়ে এবার পবিত্র হজ পালন করছেন ভাগ্যবান এক হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নিমাতা লাকা ওয়ালমুল্ক, লা শারিকা লাকা।’ অর্থাৎ- ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার।’ এ ধ্বনিতে আজ বৃহস্পতিবার মুখরিত হবে আরাফাতের ময়দান।

ধবধবে সাদা দুই টুকরো কাপড় পরে ইহরাম অবস্থায় আল্লাহর নৈকট্যলাভের আশায় সূর্যোদয়ের পরই হজযাত্রীরা মিনা থেকে রওনা হন আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে। হজের তিন ফরজের মধ্যে ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। হজযাত্রীরা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পবিত্র এ স্থানে অবস্থান করবেন। কেউ পাহাড়ের কাছে, কেউবা ইবাদত করবেন সুবিধাজনক জায়গায় বসে। আরাফাতের মসজিদে নামিরাহ থেকে স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টার পর হজের খুতবা দেবেন রয়েল কোর্টের সিনিয়র স্কলারস কাউন্সিলের সদস্য এবং উপদেষ্টা শেখ আবদুল্লাহ বিন সোলায়মান আল মানিয়া। এ বছর আরবির পাশাপাশি থাকছে আরও ১০ ভাষার খুতবা। ইতিহাসে এবারই প্রথম হজে তা বাংলায় অনুবাদ করা হবে।

খুতবা শেষে হজযাত্রীরা জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে আল্লাহর জিকির-আসকারে ব্যস্ত থাকবেন তারা। এর পর হজযাত্রীদের গন্তব্য মুজদালিফার দিকে। মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করে সেখানেই তাদের রাতযাপন। মুজদালিফা থেকে পাথর সংগ্রহ করে তারা পুনরায় মিনায় ফিরবেন। ১০ জিলহজ সেখানে পৌঁছার পর হজযাত্রীদের পর্যায়ক্রমে চারটি কাজ সম্পন্ন করতে হবে। প্রথমে মিনাকে ডানদিকে রেখে দাঁড়িয়ে শয়তানকে (জামারা) পাথর নিক্ষেপ। এর পর দ্বিতীয় কাজ আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি। তৃতীয় পর্বে মাথা ন্যাড়া করা। আর চতুর্থ কাজ তাওয়াফে জিয়ারত। হজযাত্রীরা মক্কায় ফিরে কাবা শরিফ তাওয়াফ ও সায়ি (কাবার চারদিকে সাতবার ঘোরা ও সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌঁড়ানো) করে পুনরায় মিনায় ফিরে যাবেন।

১১ জিলহজ সেখানকার খিমায় (তাঁবু) রাতযাপন; দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্তের মধ্যে হজযাত্রীরা বড়, মধ্যম ও ছোট শয়তানের ওপর সাতটি করে মোট ২১টি পাথর নিক্ষেপ করবেন। এ কাজটি অবশ্য সুন্নত। পরদিন ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থান করে পুনরায় একইভাবে তিনটি শয়তানের ওপর নিক্ষেপ করবেন সাতটি করে মোট ২১টি পাথর। এ কাজ শেষ হলে অনেকে সূর্যাস্তের আগেই মিনা ছেড়ে মক্কায় চলে যান।

করোনার কারণে এবার ব্যতিক্রমী সব পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সব হজযাত্রীকে উত্তম সেবা দেওয়ার জন্য এ বছর ১৮ হাজার ৪৯০ কর্মী নিয়োগ দিয়েছে মিউনিসিপ্যালিটি। হজের পবিত্র স্থানগুলোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে ২৮টি নতুন ও পূর্ণাঙ্গ সরঞ্জামে সুসজ্জিত সার্ভিস সেন্টার। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে কমপক্ষে সাড়ে ১৩ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী। পবিত্র মিনায় স্থাপন করা হয়েছে ৮৭ হাজার ৯০০ আন্ডারগ্রাউন্ড আবর্জনার কন্টেইনার। নজরদারিতে কাজ করবে বেশ কিছু টিম ও কমিটি। তারা মূলত নজর রাখছেন মুদি দোকান, রেস্তোরাঁ, ক্যাফেটেরিয়া, সেলুন, লন্ড্রি, বেকারি ও অন্যান্য সেবাখাতে। তারা নিয়মিত খাবারের মান পরীক্ষা এবং ধ্বংস করছেন নষ্ট জিনিসপত্র। দেখাশোনা করছেন পণ্যের দামও। পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা দেখাশোনা করছেন। পশুদের মধ্যে কোনো মহামারী আছে কিনা, তা নির্ধারণেও কাজ করছেন তারা। এ ছাড়া মক্কা মিউনিসিপ্যালিটি বিদ্যুৎ, সড়ক যোগাযোগ, টানেল, ব্রিজ, টয়লেট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা দেখাশোনা করছে। অগ্নিকা- অথবা ভারী বর্ষণে করণীয় নির্ধারণ করবে তাদের জরুরি ইউনিট।

দীর্ঘ ৯০ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম সৌদি আরবের বাইরে থেকে হজযাত্রী আসা ছাড়া এত ছোট পরিসরে পবিত্র হজ পালন করা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন সময় যুদ্ধ-বিগ্রহ, বন্যা ও অন্যান্য কারণে ৪০ বারের মতো হজ বন্ধ ছিল। করোনার কারণে এবার হাজযাত্রীরা যথাযথ দূরত্ব (১ দশমিক ৫ মিটার তথা ৫ ফুট) বজায় রেখে তাওয়াফ, নামাজে অংশ নেওয়া ও সায়ির মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করবেন পবিত্র হজ্ব।

Comments are closed.