করোনা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

Ahmad-Gias.jpg

আহমদ গিয়াস

একের পর এক প্রিয়জন না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছে। কেউ করোনায়, আর কারো মৃত্যু স্বাভাবিক। কিন্তু মৃত্যু যেভাবেই হোক না কেন এই করোনাকালে মৃত্যুবরণকারী ঘনিষ্টজনদেরকে শেষ বিদায়টা জানানোরও সুযোগ পাচ্ছি না। এ এক নির্মম সময়, যে সময়টি মনের কষ্টটিই কেবল বাড়িয়ে চলেছে। মৃত্যু এক অমোধ নিয়ম, কিন্তু এ সময়ে মৃত্যুটা যেন কারোরই কাম্য নয়।
গত পরশু করোনায় সাংবাদিক আবদুল মোনায়েম খানের মৃত্যু হয়েছে, তিনি আমার অগ্রজ সাংবাদিক এবং যাকে আমি ৩ দশকের বেশি সময় ধরে চিনি। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে কারো একটি অভিযোগও শুনিনি। কখনও মলিন চেহারা দেখিনি তাঁর, কখনও দেখিনি উগ্রতাও।

সবসময় হাসিমুখেই সম্ভাষন করতেন সবাইকে। দেশের সাংবাদিক সমাজের মধ্যে মোনায়েম ভাইয়ের মতো উন্নত চরিত্রের ব্যক্তি আমি খুব কমই দেখেছি। এমনকি আমাদের সমাজেও এই ধরনের মানুষের সংখ্যা কমেই যাচ্ছে বলে আমার বিশ্বাস। গত পরশু মোনায়েম ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে স্তব্দ হয়ে যাওয়া আমার ভারাক্রান্ত মানসপটে সারাক্ষণ তাঁর হাসিমাখা মুখটিই ভেসে চলেছে। কষ্টের মাঝেও এ এক সুখ স্মৃতি। কিন্তু তাঁকে শেষ বিদায়টা জানাতে পারিনি; এ কষ্ট ঢাকি কীভাবে? আর এ কষ্টের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিল আমার জেঠার মৃত্যু, যার শেষ বিদায় অনুষ্ঠানেও আমার যাওয়ার সুযোগ হয়নি করোনা লকডাউন পরিস্থিতির কারণে।

করোনা সংক্রমণের আশংকায় আমরা আড়াই মাস ধরে লকডাউনে, মানে ঘরে বন্দী রয়েছি। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেও একে অপরের সাথে দেখা সাক্ষাত বন্ধ। কারণ আমরা একে অপরকে করোনা ভাইরাস বহনকারী ও সংক্রমণকারী হিসাবে সন্দেহ করে চলেছি। আর এ সন্দেহ থেকেই আমরা পরস্পরকে এড়িয়ে চলছি, এমনকি নাজেহালও করছি। যেন করোনা এক সাক্ষাত যম; ধরলেই রেহাই নেই। সুতরাং মাসের পর মাস ঘরে বন্দী থাকছি। তবু বাইরে বেরোনোর সাহস পাচ্ছি না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যারা করোনা নিয়ে সবচেয়ে সচেতন ও আতংকিত; তারাই বেশি আক্রান্ত, মারাও যাচ্ছেন বেশি। আবার করোনা পজিটিভ রোগীর চেয়ে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর হার বেশি। সুতরাং করোনা এমন এক ধাঁধা, যাকে নিয়ে সরল অংক কষা দুরুহ।

করোনা ভাইরাসের এখনও কোন প্রতিষেধক বাজারে আসেনি। অর্থাৎ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে আপাতত এর কোন পথ্য নেই। তাই ভেন্টিলেটর মেশিনের মাধ্যমে অক্সিজেন দিয়েই করোনা রোগীকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়, যতদিন না (মোটামুটি পক্ষকাল) আমাদের শরীরের স্বয়ংক্রিয় রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা একটি কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে না তুলে। কিন্তু চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১০টি ভেন্টিলেটর নিয়ে যেখানে ভিআইপিদের টানাটানি; সেখানে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় সাংবাদিক মোনায়েম খান, পর্যটন ব্যবসায়ী ডালিম বা অন্য কারো সেই ভেন্টিলেটর আশা করা একটি অলীক কল্পনা নয়কি?

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে করোনার আপাতত কোন প্রতিষেধক নেই জানার পরও সবাই বাঁচার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে দৌঁড়াচ্ছেন। আবার রোগী ও তাদের স্বজনরা অভিযোগ করছেন যে, করোনা রোগীরা হাসপাতালে আদৌ কোন চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এজন্য কেউ কেউ সরকারকে, আর কেউ কেউ চিকিৎসকদের দূষছেন। কিন্তু পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ওষুধ কৌশলের উপর নির্ভরশীল একটি জাতি ও সরকার কী করে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ আশা করতে পারে, যেখানে পশ্চিমা গুরুরা কোন চিকিৎসা পথ বাতলে দেয়নি??

এখন আমাদের শরীর ফার্মের মুরগীর মতোই সামান্য অসুখেই কাহিল হয়ে যায়। অতীতে নানা অসুখে আমরা আক্রমণাত্মক চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নিয়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থাকে দূর্বল করে দিয়েছি। এখন এই ব্যবস্থাকে ফের সবল করে তোলার কৌশল অর্জন করতে হবে, আমাদের শরীরের প্রকৃতি পাঠ করতে হবে। নিশ্চয় সেই দৃষ্টান্তগুলো আমাদের প্রকৃতিতেই রয়েছে। আল্লাহর নবী হযরত (স.) বলেছেন, আল্লাহ পথ্য ভিন্ন কোন রোগ বা সমস্যা সৃষ্টি করেননি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, লা জিন লা কাজাদিখ লাক; অর্থাৎ আল্লাহ একটি শক্তির উপর আরেকটি শক্তির প্রাধান্য তৈরির মাধ্যমে পৃথিবীতে ভারসাম্য তৈরি করেছেন। সুতরাং করোনার ভাইরাসের শক্তির উপর আল্লাহ কোন শক্তিকে প্রভুত্ব দিয়েছেন, তা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।

এখন করোনারোধে আমার ব্যক্তিগত কয়েকটি টিপস রয়েছে, যার মধ্যে নাকের মাধ্যমে গরম পানির ভাপ নেয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে সর্বমহলে স্বীকৃত হয়েছে। এটা অত্যন্ত সহজ দেশীয় পদ্ধতি। অনেকেই গরম পানির ভাপ নেয়ার সময় গোলমরিচ, আদাসহ আরো কিছু উপাদান ব্যবহার করেন। এটা কার্যকরী, তবে কিছু না দিলেও সমস্যা নেই।

কখনও দুপুরের সময় বা তীব্র গরমের সময় বাইরে থেকে এসে সরাসরি টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানিতে গোসল করবেন না এবং বেশি পরিমাণ ঠান্ডা পানি পান করবেন না। ঘর্মাক্ত অবস্থায় শরীর না মুছে এসিরুমে ঢুকবেন না।

নিয়মিত মৌসুমী ফলমূল খাবেন। যেমন; আম, আনারস, লিচু, কাঁঠালসহ অন্যান্য স্থানীয় জাতের ফল। উপকুলীয় ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের ফল কেওড়াও নিয়মিত খেতে পারেন।

সৃষ্টিকর্তা আমাদের সবাইকে যেন সরল পথ দান করেন।