করোনাভাইরাসে বিশ্ব এখন বিপর্যস্ত: প্রধানমন্ত্রী

8425_me.jpg

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ
স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতির সামনে এসে নভেল করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলার কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, “এবারের স্বাধীনতা দিবস এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উদযাপিত হচ্ছে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গোটা বিশ্ব এখন বিপর্যস্ত।

“ধনী বা দরিদ্র, উন্নত বা উন্নয়নশীল, ছোট বা বড়- সব দেশই আজ কমবেশি নভেল করোনা নামক এক ভয়ঙ্কর ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশও এ সংক্রমণ থেকে মুক্ত নয়।” সারাবিশ্বে মহামারী রূপ নেওয়া কভিড-১৯ রোগে ইতোমধ্যে বিশ্বে ১৯ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে, আক্রান্তের সংখ্যা ৪ লাখ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশেও সংক্রমণ ঘটেছে প্রাণঘাতি এই ভাইরাসের, মারা গেছেন পাঁচজন, আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯ জন।

করোনাভাইরাসের ব্যাপক বিস্তার ঠেকাতে জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে; এবার স্বাধীনতা দিবসের প্রায় সব অনুষ্ঠানই বাদ দেওয়া হয়েছে। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে যেসব বিদেশি রাষ্ট্র এবং জনগণ সহযোগিতা করেছিল, তাদের স্মরণ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, “আজকের এই দিনে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি আমাদের একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন।” জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ এবং ২ লাখ নির্যাতিত নারীর প্রতিও শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী।

মানুষকে রক্ষা করাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

বিশ্বে মহামারী আকার ধারণা করা নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাংলাদেশের মানুষকে রক্ষায় সরকার এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এ পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে আমরা এবারের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ভিন্নভাবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জনসমাগম হয় এমন ধরনের সব অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে সবাইকে বিরত থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। “এই মুহূর্তে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার মানুষকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা।”

বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে অতি সংক্রামক এই ব্যাধি বাংলাদেশে ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে কী পরিণতি ঘটবে- তা নিয়ে সবার মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ-আতঙ্ক। জনসমাগমে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে বলে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা এসেছিল আগেই।

আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর সোমবার সরকার ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সব অফিস-আদালতে ছুটি ঘোষণা করে। এরপর মঙ্গলবার সড়ক, নৌ ও আকাশপথে সব ধরনের যোগাযোগও বন্ধের ঘোষণা এলে ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশও বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মত কার্যত অবরুদ্ধ দশার মধ্যে পড়ে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি জানি আপনারা এক ধরনের আতঙ্ক ও দুঃশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যাদের আত্মীয়স্বজন বিদেশে রয়েছেন, তারাও নিকটজনদের জন্য উদ্বিগ্ন রয়েছেন। আমি সকলের মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি। “কিন্তু এই সঙ্কটময় সময়ে আমাদের ধৈর্য এবং সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।”

সঙ্কটে কেউ সুযোগ নেবেন না

নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সঙ্কটকালীন এই পরিস্থিতির সুযোগ না নিতে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, “এ সঙ্কটময় সময়ে আমাদের সহনশীল এবং সংবেদনশীল হতে হবে। কেউ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন না।”

করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলায় বিশ্বের হিমশিম খাওয়ার মধ্যে বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একথা বলেন শেখ হাসিনা। নভেল করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেওয়ার পর বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে অতি সংক্রামক এই ব্যাধি বাংলাদেশে ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে কী পরিণতি ঘটবে- তা নিয়ে সবার মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ-আতঙ্ক।

জনসমাগমে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে বলে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সড়ক, নৌ ও আকাশপথে সব ধরনের যোগাযোগও বন্ধের ঘোষণা এসেছে। কার্যত অবরুদ্ধ দশার মধ্যে বাজারে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাজারে কোনো পণ্যের ঘাটতি নেই। দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরের সঙ্গে সরবরাহ চেইন অটুট রয়েছে। “অযৌক্তিকভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি করবেন না। জনগণের দুর্ভোগ বাড়াবেন না। সর্বত্র বাজার মনিটরিং-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে।” পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্যকর্মীসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনের সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীরও কাজ করে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।

শেখ হাসিনা গুজব রটনাকারীদের সতর্ক করে বলেন, “কেউ গুজব ছড়াবেন না। গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” এই সঙ্কটময় সময় মোকাবেলায় সবাইকে ধৈর্য ধরার পাশাপাশি আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি। “আতঙ্ক মানুষের যৌক্তিক চিন্তাভাবনার বিলোপ ঘটায়। সব সময় খেয়াল রাখুন আপনি, আপনার পরিবারের সদস্যগণ এবং আপনার প্রতিবেশীরা যেন সংক্রমিত না হন। আপনার সচেতনতা আপনাকে, আপনার পরিবারকে এবং সর্বোপরি দেশের মানুষকে সুরক্ষিত রাখবে।”

গৃহহীনদের ঘর-খাবার দেওয়ার নির্দেশ

নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যয়ে পড়া গরিব মানুষের জন্য সরকারের কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে এক্ষেত্রে ধনীদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি তুলে ধরার পাশাপাশি প্রণোদনামূলক কর্মসূচিও ঘোষণা করেন।

নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তারের গতি কমিয়ে আনার মরিয়া চেষ্টায় সারা দেশে ছুটি ঘোষণার পর সড়ক, নৌ ও আকাশপথে সব ধরনের যোগাযোগও বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মত ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশও কার্যত অবরুদ্ধ দশার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। সবচেয়ে বিপদে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষেরা।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য যেসব প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছেন, তা হল

>> নিম্ন আয়ের ব্যক্তিদের ‘ঘরে-ফেরা’ কর্মসূচির আওতায় নিজ নিজ গ্রামে সহায়তা প্রদান করা হবে।

>> গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ৬ মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। জেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

>> ভাষাণচরে ১ লাখ মানুষের থাকার ও কর্মসংস্থান উপযোগী আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে কেউ যেতে চাইলে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

>> বিনামূল্যে ভিজিডি, ভিজিএফ এবং ১০ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। একইভাবে বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সেবা ও দেওয়া হচ্ছে।

এই পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।” সীমিত আয়ের মানুষকে কেনার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এখন কৃচ্ছতা সাধনের সময় মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, “যতটুকু না হলে নয়, তার অতিরিক্ত কোনো ভোগ্যপণ্য কিনবেন না, মজুদ করবেন না।”

এ বছর রোপা আমনের বাম্পার ফলনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি গুদামগুলোতে ১৭ লাখ মেট্রিক টনের বেশি খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। “এছাড়া, বেসরকারি মিল মালিকদের কাছে এবং কৃষকদের ঘরে প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুদ আছে। চলতি মওসুমে আলু-পেঁয়াজ-মরিচ-গমের বাম্পার ফলন হয়েছে।”

কোনো জমি ফেলে না রেখে আরও বেশি বেশি ফসল ফলানোর জন্য কৃষকদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারের উপর আস্থা রাখতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “আজ সমগ্র বিশ্ব এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলছে। তবে যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আমাদের সরকার প্রস্তুত রয়েছে। “আমরা জনগণের সরকার। সব সময়ই আমরা জনগণের পাশে আছি। আমি নিজে সর্বক্ষণ পরিস্থিতির উপর নজর রাখছি।”