আপডেটঃ
রামুর গর্জনিয়া বাজার-দৌছড়ি সড়কের বহাল দশাশার্শায় মাদক মামলার আসামী বাপ্পী অস্ত্র সহ আটকমহেশখালিতে দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধ মাদক ব্যবসায়ি নিহতকক্সবাজারে বন্দুকযুদ্ধ শুরু,নিহত মাদক কারবারি হাসানতাসপিয়া হত্যায় অপর আসামী গ্রেফতারনতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের ৬ কমিটি বিলুপ্তযশোরে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় ছুরিকাঘাত : আহত নারীর মৃত্যুবেনাপোল দিয়ে আট দিনে দশ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানিক্রসফায়ারে ভীত নই : বদিইউএস-বাংলায় চাকরিবাংলাদেশ ব্যাংকে অফিসার পদে পরীক্ষা শুক্রবার‘আর্জেন্টিনাই এবার বিশ্বকাপ জিতবে’চট্টগ্রাম রেঞ্জের সেরা ওসির পুরস্কার পেলেন রনজিত বড়ুয়ারোজায় খেজুর কেন খাবেন?নিজ গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত মুক্তামণি

বিবেকের ‘ডান হাত’ ভেঙে গেছে

Probhash-amin_2_1.jpg

প্রভাষ আমিন

নানা ব্যস্ততার কারণে রাজীব হোসেনের দুর্ঘটনা নিয়ে কিছু লেখা হয়নি। কিন্তু পত্রিকায় ছাপা হওয়া দুর্ঘটনার ছবিটি এমনভাবে মাথায় গেঁথে ছিল, কিছুতেই বের করতে পারছি না। পত্রিকায় ছাপা হওয়া ছবিটি দেখে আমি তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বুঝতে পারিনি। ক্যাপশন পড়ে বড় একটা ধাক্কা খাই। দুই বাসের মাঝে চাপা পড়া একটি হাত। এক ফোটা রক্ত নেই। কিন্তু কি ভয়াবহ ছবি। আমার কাছে ছবিটি আলোকচিত্র নয়, যেন বিমূর্ত চিত্রকলা মনে হচ্ছে। যেন ছবিটি সত্যি নয়, বানানো। একজন মানুষের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ তার হাত। সেই হাতটি বিচ্ছিন্ন হয়ে দুই বাসের চিপায় আটকে আছে। ছবি দেখার দরকার নেই। বিষয়টি ভাবতেই আমার গা শিউরে উঠছে। লেখাটা শুরু করলেও শেষ করা হয়নি। সোমবার মধ্যরাতে রাজীবের মৃত্যুর খবরে গভীর বিষাদে ছেয়ে গেল মনটা। আহারে এতিম ছেলেটা সবার ওপর অভিমান করে চলেই গেল।

রাজীব ছিল একটি সংগ্রামী ছেলে। ছেলেবেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছে। মামা-চাচা-খালাদের সহায়তা, নিজের টিউশনি আর ছোটখাটো চাকরি করে এগিয়ে যাচ্ছিল স্বপ্নের দিকে। শুধু রাজীব নয়, রাজীবের দিকে তাকিয়ে ছিল তার ছোট দুই ভাইও। দুর্ঘটনার পর ঢাকা মেডিকেলে তার এক ছোট ভাই কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, শুধু রাজীব ভাই নয়, আমাদের স্বপ্নও তো শেষ হয়ে গেল। রাজীবের মৃত্যতে তার ছোট দুই ভাই আরেকবার এতিম হয়ে গেল।

ছবিটি ছাপা হয়েছে বলে রাজীবের দুর্ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে এতো আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিন রাজপথে কত স্বপ্ন হারিয়ে যায়, ভেঙে যায় তার খবর আমরা কতটা রাখতে পারি? আমরা বলি বটে সড়ক দুর্ঘটনা। কিন্তু আমি এসব ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলি না। দুর্ঘটনা হলো যেটা অনিচ্ছায় ঘটে যায়। কিন্তু একযুগেরও বেশি সময় গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি আমাদের দেশে অধিকাংশ ‘দুর্ঘটনা’ ঘটে চালকের অদক্ষতা, খামখেয়ালি, অমানবিকতা, তাড়াহুড়োর কারণে। অল্পকিছু ঘটে বাহনের ত্রুটির কারণে, অল্পকিছু ঘটে পথচারীর খামখেয়ালিপনায়। চালক সতর্ক থাকলে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। অসতর্কতায় কিছু একটা ঘটে গেলেও মানবিক হলে তার ভয়াবহতা কমিয়ে রাখা সম্ভব। ঢাকার অনেকগুলো ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে চালক গাড়ি থামিয়ে দিলে বড় বিপর্যয় নাও ঘটতে পারতো। অনেক সময়ই চালক আরো জোরে গাড়ি চালিয়ে দিয়ে অনেকের স্বপ্ন চাপা দিয়ে চলে যান। মানুষকে টেনে নিয়ে যান মৃত্যু পর্যন্ত।

ব্যাঙের গল্পটি আপনাদের সবারই জানা। কয়েক শিশু মিলে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে খেলার ছলে ঢিল ছুঁড়ছিল। তাতে প্রাণ যাচ্ছিল ব্যাঙদের। এক বয়স্ক ব্যাঙ কোনোরকমে পাড়ের কাছে এসে শিশুদের বললেন, তোমাদের জন্য যা খেলা, আমাদের জন্য তা মৃত্যু। আমাদের সড়ক-মহাসড়কের চালকরা যেন সেই শিশুদের মতো, আমাদের প্রাণ নিয়ে তারা খেলছে। চালকরা যেভাবে একজন আরেকজনকে ওভারটেক করার প্রতিযোগিতায় নামে; মনে হয় বাস্তবে নয়, তারা কম্পিউটার স্ক্রিনে রেসিং গেম খেলছেন। তারা যেন টেরই পান না, তাদের এই খেলায় কত প্রাণ যায়, কত স্বপ্ন ধূসর হয়ে যায়। আগেই বলেছি, রাজীবের ঘটনার ছবিটি ছাপা হয়েছে বলেই এ নিয়ে এতো আলোচনা। কিন্তু ঢাকার বাসের গায়ের দিকে তাকালে আপনি বুঝবেন, প্রতিদিনই বাসে বাসে টক্কর লাগে। প্রতিদিনই এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।

রাজীবের ঘটনার দুদিন পরই দুই বাসের মাঝে চাপা পড়ে ধানমন্ডিতে আয়েশা বেগম নামে এক নারীর কোমর ভেঙে গেছে। ঢাকার মানুষ আসলে রাস্তায় পরিবহন খাতে মাস্তানদের হাতে জিম্মি। আমরা এমনিতে কথায় কথায় বলি, অমুক তমুকের ডান হাত। তার মানে ডান হাত হলো আমাদের সবচেয়ে বড় সহায়। দুর্ঘটনায় রাজীব প্রথমে তার সেই ডান হাতটি হারিয়েছিল। ডান হাত ছাড়া দারিদ্র্যের অথৈ সাগর সে কিভাবে সাঁতরাবে? কিভাবে দুই ভাইকে মানুষ করবে- আলোচনা ছিল তা নিয়ে। এখন সব প্রশ্ন-জিজ্ঞাসার ঊর্ধ্বে উঠে গেল রাজীব। ছোট ভাইকে নিয়ে আর ভাবতে হবে না তাকে।

রাজীবের ঘটনায় আমার মনে হয়েছে, আসলে আমাদের চালকদের বিবেকের ‘ডান হাত’ হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। তারা মানুষকে মানুষ মনে করে না। এখন রাজপথে কারো হাত যাবে, কারো পা যাবে আর কারো কোমর ভেঙে যাবে। শুধু চালকদের বিবেকের ডান হাত নয়, আমাদের নৈতিকতার ডান হাতও ভেঙে গেছে।

সাম্প্রতিক আরো দুটি ঘটনা বড় ধাক্কা দিয়েছে আমাদের বিশ্বাসে, বিবেকে ও নীতি-নৈতিকতায়। রংপুরের আইনজীবী রথীশ চন্দ্র নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। তার নিখোঁজ নিয়ে নানারকম আলোচনা হচ্ছিল। এমনকি অভিযোগের তালিকায় ছিল জঙ্গিরাও। পরে জানা গেল, স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমের বলি আইনজীবী রথীশ। প্রেমিক কামরুল ইসলামের সাথে মিলে স্বামীকে হত্যা করেছেন স্ত্রী দীপা ভৌমিক।

তারচেয়ে বিস্ময়কর হলো এই দীপা আর কামরুল ২৫ বছর ধরে শিক্ষকতা করছিলেন একই স্কুলে। দুজনই ধর্ম শিক্ষক। দীপা হিন্দু ধর্মের আর কামরুল ইসলাম ধর্মের। ধর্ম শিক্ষক, যাদের মূল কাজ হলো শিক্ষার্থীদের নীতি-নৈতিকতা শেখানো। সেই দুজন মিলে কিনা খুন করে ফেললেন একজন আইনজীবীকে! আমাদের নীতি-নৈতিকতার ডান হাত তাহলে খোয়া গেছে অনেক আগেই।

হবিগঞ্জে ধর্ষিতা বিউটির মৃত্যু তোলপাড় ফেলেছে সারাদেশে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে থেকে আলোচনার শুরু। তারপর দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। দেশজুড়ে গড়ে ওঠে প্রবল জনমত। দ্রুত ধরা পড়ে অভিযুক্ত বাবুল মিয়া। ফেসবুকে প্রবল চাপ ছিল বাবুল মিয়াকে ক্রসফায়ারে দেয়ার। বাবুল মিয়া অপহরণ ও ধর্ষণের কথা স্বীকার করলেও হত্যার কথা স্বীকার করেনি। পরে জানা গেল, মামলার বাদী এবং বিউটির বাবা সায়েদ আলীই বিউটিকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এবং নিজের পরিবারের সম্মান (!) বাঁচাতে বাবা সায়েদ আলী এবং চাচা ময়না মিয়া মিলেই বিউটিকে হত্যা করিয়েছে। কী ভয়ঙ্কর কথা! বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়।

একটা মেয়ে সবচেয়ে নিরাপদ তার বাবার কাছে। বলা হয়, প্রতিটি মেয়েই তার বাবার কাছে রাজকন্যা। সেই বাবাই যখন পরিকল্পনা করে মেয়েকে হত্যা করায়, আমাদের বিশ্বাসের ভিত নড়ে যায়। আমরা বুঝি আমাদের বিশ্বাসের ‘ডান হাত’ ভেঙে গেছে। এভাবেই একে একে ধসে পড়ে আমাদের বিশ্বাসের, আমাদের মানবিকতার, আমাদের বিবেকের আর আমাদের নীতি-নৈতিকতার ‘ডান হাত’। আমরা ক্রমশ অসহায় হয়ে যাই। মানুষ হিসেবে আমরা খাটো হয়ে যাই। কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো আমরা?

প্রভাষ আমিনসাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান : এটিএন নিউজ।
probhash2000@gmail.com

Top