আপডেটঃ
উখিয়া-টেকনাফবাসী রোহিঙ্গাদের জন্য যে উদারতা দেখিয়েছে তা মাদকের বদনামে ধুলিস্যাৎ করা যাবেনাঃ বাহাদুরমাস্টার্স ফাইনালে কক্সবাজার সিটি কলেজের পাশের হার ৮৭%মির্জা ফখরুলের বক্তব্য ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’র সামিল: কাদেরঈদ যাত্রা: শিডিউলে নেই ট্রেন, ঠিক সময়ে মিলছে বাসঈদ: মশলার জোগাড়, দেরি নয় আরনিরাপদ বাংলাদেশের দাবিতে আসুন ঐক্যবদ্ধ হই: ফখরুলসজল-মিমের বিপরীত ভালোবাসাপাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানচট্টগ্রাম যুবকের গলা কাটা লাশ: ডা.রোকসানা আটকযশোরের শার্শা সীমান্ত হতে ৭১৫ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধারবিএনপি নেতা খসরুকে দুদকে তলববুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় গোলাম সারওয়ারঅটল বিহারী বাজপেয়ী আর নেইমুক্তিযোদ্ধা বিন্টু মোহন বড়ুয়া ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নিবেদিত প্রাণ সমাজ সেবক- এমপি কমলবহু ব্যবসায়ীকে পথে বসিয়ে দেওয়া সেই প্রতারক ডিবির হাতে গ্রেফতার

এই বিপর্যয় ঠেকাবে কে?

Razuan-rahamain.jpg

রেজানুর রহমান

জেনে শুনে বিষ করেছি পান ব্যাপারটা কি শেষ পর্যন্ত সে রকমই হয়ে যাচ্ছে? বিভিন্ন পত্রিকাসহ প্রচার মাধ্যমের খবর পড়ে ও দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। প্রচার মাধ্যমের খবর- ‘সম্ভব হলে দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শেষ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার যৌথ ভাবে মাঠ পর্যায়ের চুক্তি সই করেছে। ব্যক্তি নয়, রোহিঙ্গাদের পারিবারিক আবেদন করতে হবে।

প্রতিদিন যাবে ৩০০ রোহিঙ্গা। মিয়ানমারে গিয়ে শুরুতে তাদেরকে অস্থায়ী শিবিরে অবস্থান করতে হবে।

আপাতত: দৃষ্টিতে এটি স্বস্থিদায়ক খবর। কিন্ত ততদিনে আমাদের নিজেদের অবস্থাটা কেমন হবে? মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে গিয়ে না আমরাই কোনো বিপর্যয়ে পড়ি…

কয়েকদিন আগে দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের একটি রিপোর্টে ভয়াবহ শিরোনাম ছাপা  হয়েছে। “স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রোহিঙ্গারা, বিতাড়িত রোগ বালাই ফিরে আসার ভয়”। শিরোনাম  পড়েই বোধকরি অনেকে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠেছেন। তবুও রিপোর্টটির সারাংশটা উল্লেখ করি।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালানোর সময় অনিশ্চিৎ ভবিষ্যৎ শুধু নয় কিছু রোগ ব্যাধিও সঙ্গে নিয়ে এসেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম স্বয়ং বলেছেন, ‘মানবিক কারণে আমরা রোহিঙ্গাদের এদেশে আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু তাদের মাধ্যমে এখন আমাদের দেশেও পোলিও, ডিপথেরিয়া, এইডস-এর মতো প্রাণঘাতী রোগ ছড়ানোর ভয় রয়েছে।’

তার মানে ব্যাপারটা অনেকটাই জেনে শুনে বিষ পান করার মতোই তো হয়ে গেল। মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে আমরা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা অসহায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত রোগ বালাইয়ের প্রকোপে পড়ে আমরাই না আবার বিপদগ্রস্ত হয়ে উঠি।

বাংলাদেশ এখন পোলিওমুক্ত দেশ। ডিপথেরিয়া নেই অনেক দিন। হামের প্রকোপ নেই বললেই চলে। অথচ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনেকে এসব রোগ বালাই নিয়ে এসেছে আমাদের দেশে। ইতোমধ্যে ডিপথেরিয়ায় ২৮ জন, এইডস-এ ৩ জন ও হামে একাধিক রোহিঙ্গা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। একথা সত্য, বিশ্বে বর্তমান সময়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর তালিকায় রোহিঙ্গাদের নাম সবার ওপরে উঠে আসবে। আর তাই মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে।

কিছুদিন আগে শোনা গিয়েছিল মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কিন্তু কার্যত এক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতির সংবাদ নাই। বরং যে সময়ে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলছে সেই সময়ে প্রতিদিনই মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের স্রোত বাংলাদেশের দিকেই আসছে। সাথে বয়ে নিয়ে আসছে মরণঘাতী নানা রোগ বালাই। ফলে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

শুধু কী স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ?

ঝুঁকি আরও আছে। বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ অবৈধ পস্থায় বাংলাদেশের পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এই অবৈধ কাজে তাদেরকে সহযোগিতা করছে এ দেশেরই দুর্ণীতিগ্রস্ত কিছু  মানুষ। দেশের একজন সাধারণ মানুষকে বৈধ উপায়ে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গেলে কত কাগজপত্রই
না দেখাতে হয়। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়েও অনেকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

এমন বাস্তবতায় রোহিঙ্গারা কীভাবে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশে যাচ্ছে এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর প্রয়োজন। একটি টিভি চ্যানেলে একজন প্রবাসীর  সাক্ষাৎকার দেখে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বেড়ে গেল। তার মতে, বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গারা  মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে বাংলাদেশের বদনাম হচ্ছে। আরও বিব্রতকর তথ্য হলো, বাংলাদেশের পাসপোর্ট ধারী রোহিঙ্গাদের অনেকে নাকি পাকিস্তানি নাগরিকদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলার ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী।

শুধু রোগ বালাই নয় রোহিঙ্গাদের কারণে পার্বত্য এলাকার জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে এ ব্যাপারে আমরা কতটুকু সচেতন রয়েছি?

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে পাহাড় কেটে, বন ধ্বংস করে একের পর এক রোহিঙ্গা শিবির গড়ে তোলা হচ্ছে। যে সব এলাকায় শিবিরগুলো তৈরি করা হচ্ছে সেখানে ছিল বন্য প্রাণীদের বসতি। রোহিঙ্গা শিবিরগুলো ওই এলাকার জীব বৈচিত্র্যকে মারাত্মক সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

ইউএনডিপির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের শিবিরগুলো প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন স্বীকৃত তিনটি এলাকা যথাক্রমে টেকনাফ উপদ্বীপের উপকূল এলাকা, সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও সোনাদিয়া দ্বীপের প্রকৃতি ধ্বংস করছে। হিম ছড়ি ন্যাশনাল পার্ক ও টেকনাফ অভয়ারণ্য, প্রস্তাবিত ইনানী ন্যাশনাল পার্কও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সহসাই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে দিনে দিনে পরিবেশগত বিপর্যয় মারাত্মক হয়ে উঠবে। ফলে গোটা এলাকার ১ হাজার ১৫৬ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

এত গেল উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর কথা। সহসাই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে মানুষ নামের প্রাণীও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। একথা বোধকরি সকলেই জানেন উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর তুলনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অনেক কম। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দারা রোহিঙ্গাদের কাছে অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। দিনে দিনে এই সব এলাকায় রোহিঙ্গাদের জনস্রোত বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে রোগ বালাই। বাড়ছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, টেকনাফ ও উখিয়ায় ৪ হাজার ৩০০ একর এলাকায় ৬ লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে দুই উপজেলা মিলিয়ে স্থানীয় বাসিন্দার সংখ্যা রয়েছে ৬ লাখ। তার মানে স্থানীয়দের চেয়ে আশ্রিতদের সংখ্যাই তো বেশি হয়ে গেল। এমন পরিস্থিতিতে আশ্রিতরা কি স্থানীয়দের মানবেন? এই বিপর্যয় ঠেকাবে কে?

রেজানুর রহমান : কথাসাহিত্যিক, পরিচালক, সাংবাদিক।
rezanur.alo@gmail.com

Top