আড়াই পয়সার জাসদ

Probhash-amin.jpg

প্রভাষ আমিন; বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

সমমনা রাজনৈতিক দল মিলে জোট গড়ার প্রবণতা বিশ্বে নতুন নয়। বাংলাদেশেও জোটের রাজনীতির হিসাব বহু পুরনো। ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে লড়তে যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বিরোধী দলগুলো। স্বাধীন বাংলাদেশে পঁচাত্তরের পর পর দুটি সামরিক শাসন থেকে দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির উদ্ভব ঘটেছিল জোট এবং ফ্রন্ট গঠনের ধারাবাহিকতায়ই।

তবে বাংলাদেশে কার্যকর রাজনৈতিক জোট হয়েছিল স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়। প্রথমে আওয়ামী লগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোট এবং বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট এরশাদের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করে।

পরে ১৫ দলীয় জোট ভেঙে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দলীয় জোট এবং বামদের ৫দলীয় জোটের যুগপৎ আন্দোলনেই স্বৈরাচারের পতন ঘটে। এরশাদের পতনের পর রাজনীতিতে নানা মেরুকরণ হয়েছে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির জোটে না থাকলেও এখন বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্ক

কাঁঠালের আঠার মতো। আর যে এরশাদের বিরুদ্ধে ৯ বছরের আন্দোলন সেই এরশাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হতে সময় লেগেছে মাত্র ৫ বছর। তারপর কখনো আওয়ামী লীগ, কখনো বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে শাস্তি এড়িয়েছেন এরশাদ। জোটের রাজনীতির হিসাবটা বড় জটিল। কখনো ভোটের হিসাবে জোট হয়, কখনো আদর্শের প্রশ্নে।

তবে জোটের প্রশ্নে আদর্শিক নৈকট্য একটা বড় ভূমিকা রাখে। জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধা নিয়ে বিএনপিকে ঘরে-বাইরে অনেক সমালোচনা শুনতে হয়েছে। কিন্তু শত আঘাতেও বিএনপি-জামায়াতের প্রেমে ভাঙন ধরাতে পারেনি আওয়ামী লীগ। কারণ আসল হিসাবটা স্বার্থের, আসল অঙ্কটা ভোটের। আলাদা ভাবে নির্বাচন করলে জামায়াত হয়তো ৫/৭টা আসন পাবে।

কিন্তু সারা দেশেই তাদের অল্প কিছু ভোট আছে। যেই ভোটটা যোগ হলে বিভিন্ন আসনে এগিয়ে যায় বিএনপি বা জোটের প্রার্থী। স্বার্থটা এখানেই। বিএনপি যেমন রাজাকারের সঙ্গে জোট করে সমালোচিত, আওয়ামী লীগও তেমনি স্বৈরাচারের সঙ্গে জোট বেঁধে সমালোচিত। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেই সমালোচনাকে পাত্তাই দেয়নি।

কারণ আওয়ামী লীগ জানে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি যে কার্যকর ভোটের জোট গড়েছে, তার কাউন্টার দিতে জাতীয় পার্টির ভোট ব্যাংক তার লাগবেই। সমালোচনার ক্ষতে প্রলেপ দিতেই ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদের মতো প্রগতিশীল দলকে সঙ্গে নিয়ে ১৪ দলীয় জোট গড়েছে আওয়ামী লীগ।

তবে আওয়ামী লীগ জানে ১৪ দলীয় জোট আসলে কিছু না, আসল অঙ্ক জাতীয় পার্টি। তাই ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদের আপত্তির কারণে আওয়ামী লীগ কিন্তু জাতীয় পার্টিকে ১৪ দলের জোটে নিতে পারেনি। তাই বর্তমান সরকার কিন্তু নিছক ১৪ দলীয় জোটের সরকার নয়, জাতীয় পার্টিসহ মহাজোটের সরকার।

জোট গঠনের হিসাব-নিকাশ দেখলে আমার মাঝে মাঝে মাথা আউলাইয়া যায়। এই যেমন বিজয় অর্জনের মাত্র ১০ মাসের মাথায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা দরকার, তখনই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ নিয়ে জাসদের জন্ম। আজ জাসদ অনেক নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির কথা বলে, কিন্তু জন্ম থেকেই জাসদ এগিয়েছে সন্ত্রাস-সহিংসতা আর ষড়যন্ত্রে ভর করে।

আজ বিএনপি আওয়ামী লীগের যতটা বিরুদ্ধে, পঁচাত্তরের আগে জাসদ ছিল তার শতগুণ। থানায় হামলা, পাটের গুদামে আগুন, ঈদের জামাতে এমপি খুন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসা ঘেরাও, ভারতীয় হাইকমিশনারকে অপহরণের চেষ্টা, বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত করতে হেন কোনো চেষ্টা নেই তারা করেনি।

কদিন আগেও আওয়ামী লীগ নেতারা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য জাসদকে দায়ী করেছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত জাসদের ভূমিকা ছিল আরও রহস্যময়। জিয়াকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল জাসদই। জিয়া বিশ্বাসঘাতকতা না করলে আজ জাসদের অবস্থান কোথায় থাকতো? সেই জাসদ আজ আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী।

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু আজ তথ্যমন্ত্রী। হাসানুল হক ইনুর প্রতি আমার খুব ব্যক্তিগত একটা কৃতজ্ঞতা আছে। গণঅভ্যুত্থানে পতনের পর এরশাদের বিরুদ্ধে নানা মামলা হয়েছে। কিন্তু আমরা এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলাম অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের দায়ে। সেই মামলাটি করেছিলেন হাসানুল হক ইনু। মামলাটির কিছু হয়নি।

কিন্তু ইতিহাসে এই নৈতিক অবস্থানটি থাকলো যে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলই এরশাদের আসল অপরাধ। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধার সময়ও এরশাদের ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিলেন হাসানুল হক ইনু। যার কারণে এরশাদকে জোটে নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ।

আমার ভালো লেগেছে, যাক অন্তত একজন মানুষ আছেন, যিনি এখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আবেগটা এখনো ধারণ করেন। কিন্তু হতাশ হয়ে দেখলাম অসুস্থ এরশাদকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান হাসানুল হক ইনু। জোটের ভোটের হিসাবে নিজেদের মাপেন এরশাদের পাল্লায় তুলেই। এই হিসাবের কথা বলতেই আজকের লেখা।

পঁচাত্তরের আগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিল বলেই, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধা যাবে না; এমনটা আমি মনে করি না। একসময় নিজেরা নৈরাজ্যের রাজনীতি করেছে বলেই, সন্ত্রাসের বিরোধিতা করা যাবে না; এমনটাও আমি মনে করি না। বরং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাসদের জোটটা যতটা না ভোটের, তারচেয়ে অনেক বেশি আদর্শিক।

তারপরও আওয়ামী লীগ নেতারা সুযোগ পেলেই জাসদকে খোঁচাখুঁচি করেন। কুষ্টিয়ার স্থানীয় রাজনীতিতেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাসদের সাপে-নেউলে সম্পর্ক। উত্ত্যক্ত হয়ে জাসদ মাঝে মাঝে পাল্টা জবাব দেয়। তাই নিয়ে হৈচৈ বেঁধে যায় রাজনীতিতে। যেমন গত বুধবার কুষ্টিয়ার এক সমাবেশে হাসানুল হক ইনু রীতিমত হুমকি দিয়েছেন আওয়ামী লীগকে।

জাসদ নেতা দারুণ এক অঙ্ক আবিষ্কার করেছেন- ‘জাসদ ঐক্যের মর্যাদা রাখবে। পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করবেন না। আপনি আশি পয়সা। আর এরশাদ, দিলীপ বড়ুয়া, মেনন আর ইনু মিলে এক টাকা হয়। আমরা যদি না থাকি, তবে আশি পয়সা নিয়ে রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরবেন; এক হাজার বছরেও ক্ষমতার মুখ দেখবেন না।’ অবশ্যই কড়া হুমকি।

তবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জবাব দিয়েছেন ঠাণ্ডা মাথায়, ‘আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনে গেলে ফলাফল কী হবে সেটা ইনুও জানেন’। আসলে মশাল মার্কা নিয়ে একা নির্বাচন করলে জাসদের কেউ কোনো পর্যায়েই নির্বাচিত হতে পারবেন না, এটাই বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতা।

অনেকে বলছেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে দর কষাকষির জন্যই এমন হুমকি হাসানুল হক ইনুর। হাসানুল হক ইনু বলেছেন, তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয় বলেই তিনি এমন কথা বলেছেন। কিন্তু ইনু তার বক্তব্যে মহাজোটের আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল আর জাসদকেই কেবল গোনায় ধরেছেন।

এখন ১৪ দলীয় জোটের বাকি ১০ দলের কেউ যদি ইনুর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ আনেন, কী জবাব দেবেন তিনি? বাস্তবতা হলো মহাজোটে আওয়ামী লীগ আশি হলে জাতীয় পার্টি পাবে ১৫। বাকি ১৩ দলকে অবশিষ্ট ৫ নিয়ে কামড়া-কামড়ি করতে হবে।

তবুও আমি যদি ইনুর হিসাবই মানি। আওয়ামী  লীগ আশি। বাকি বিশ যদি আমি জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল, জাসদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দিই, তাহলে জাসদের ভাগে পড়বে ৫। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে থাকতে জাসদ আরেক দফা ভেঙেছে। তাই শেষ পর্যন্ত হাসানুল হক ইনুর জাসদ পাবে আড়াই পয়সা।

অঙ্কের এই হিসাবটা সাংবাদিক মিঠুন মোস্তাফিজের। আমার ফেসবুক স্ট্যাটাসে এক মন্তব্যে তিনি এই অঙ্ক দিয়েছেন। একসময় বাংলাদেশে একটি জনপ্রিয় সিনেমা ছিল ‘দুই পয়সার আলতা’ নামে।

এখন হাসানুল হক ইনুর নতুন অঙ্কের পর কেউ যদি জাসদকে ‘আড়াই পয়সার জাসদ’ বলে, তাকে কি খুব দোষ দেওয়া যাবে?

প্রভাষ আমিন: সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ।
probhash2000@gmail.com

Top