প্রধান বিচারপতি ইস্যুতে আবারও উত্তেজনা

Law.jpg

ওয়ান নিউজ ডেক্স:  প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ইস্যুটি আবারও নতুন করে জটিল আকার ধারণ করেছে। আদালত অঙ্গন ছাড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও ইস্যুটি উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। সকল মহলে এখন আবার সেই একই গুঞ্জন- প্রধান বিচারপতি ইস্যুর কীভাবে ফয়সালা হবে? এসকে সিনহা কি চেয়ারে বসতে পারবেন?
প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার ছুটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১০ নভেম্বর। ছুটির মেয়াদ শেষের সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেশে ফিরতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছিল। এমন জোর আভাসও পাওয়া যাচ্ছিল। আর সেই প্রেক্ষাপটে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলগুলোও তৎপর হয়ে উঠেছে। এরা যেন কিছুতেই এসকে সিনহাকে পদে বসতে দিতে চান না। বিশেষ করে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বার বার বলছেন, এসকে সিনহার পদে বসা ‘সুদূর পরাহত’। এক্ষেত্রে তার যুক্তি হলো, আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিরা যেহেতু প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসতে চান না তাই প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা তার পদে বসার সুযোগ নেই। এমনকি এসকে সিনহার পদে বসার চেষ্টাকে তিনি আদালত অবমাননা বলেও আখ্যায়িত করেন।
অন্যদিকে আজ ৮ অক্টোবর বুধবার সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, এসকে সিনহার সঙ্গে অন্য বিচারপতিদের বসতে না চাওয়াটাই বরং সংবিধান লঙ্ঘন ও আদালত অবমাননা। এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের কর্মকা-কে সংবিধান লঙ্ঘন বলেও আখ্যায়িত করেছে বার এসোসিয়েশন। এমনকি রাষ্ট্রপতি কেন বিচারপতিদের ঘন ঘন ডাকছেন, এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন।
উল্লেখ্য, প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা কেন্দ্রীক দেশের সর্বোচ্চ আদালত অঙ্গনের এ সংকটটি শুরু হয়েছিল মূলত গত ২ অক্টোবর বহুল বিতর্কিত এক মাসের ছুটি চাওয়াকে কেন্দ্র করে। ৩ অক্টোবর ছিল সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘ অবকাশকালীন ছুটির পর আদালত খোলার দিন। অতীতের রেওয়াজ অনুযায়ী এ দিনটিতে সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে বিচারপতিদের চা-চক্রের মিলনমেলা হয়। তারই প্রস্তুতি নিতে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ২ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টে তার অফিসে যান। কিন্তু, হঠাৎ এমন খবর আসে যে এসকে সিনহা ক্যান্সারজনিত অসুস্থ্যতার কারণে ১ মাসের ছুটি চেয়েছেন।
এ খবরটা আদালত অঙ্গন ছাড়িয়ে রাজনৈতিকসহ সকল মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কারণ, এর আগে থেকেই ষোড়শ সংশোধনীর রায়কে কেন্দ্র করে এসকে সিনহার সঙ্গে সরকারের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এমনও কথা প্রচারিত হচ্ছিল যে, এসকে সিনহাকে সরকার জোর করে ছুটিতে পাঠাতে পারে বা পদত্যাগে বাধ্য করতে পারে।
ফলে প্রধান বিচারপতির এক মাসের ছুটি চাওয়ার ব্যাপারটিকে সচেতন মহলের কেউ স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছিল না। সুপ্রিম কোর্ট র্বা এসোসিয়েশন এবং বিএনপিসহ বিরোধীদলসমুহের পক্ষ থেকে এই মর্মে বার বার বলা হচ্ছিল যে, প্রধান বিচারপতিকে জোর করে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। অবশেষে ১৩ অক্টোবর বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে এসকে সিনহা লিখিত এবং মৌখিকভাবে সাংবাদিকদের বলে গেছেন, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ্য। আবার ফিরে আসবেন। সরকারের খারাপ আচরণের কথাও তিনি আভাসে-ইঙ্গিতে কিছুটা তুলে ধরেছেন লিখিত বক্তব্যে।
এরফলে বিভিন্ন মহল থেকে এমন বক্তব্য দেয়া হচ্ছিল যে, প্রধান বিচারপতিকে জোর করে ছুটিতে পাঠানোর কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এ সময় সরকার খুব বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে রেজিস্ট্রার জেনারেলের স্বাক্ষরে এই মর্মে বিবৃতি দেয়া হয় যে, আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসতে রাজি নন। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১১টি দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এরপর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলতে শুরু করেন, এসকে সিনহার প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ফিরে আসা সুদূর পরাহত।
এসব বিতর্কের মধ্যেই ১৬ অক্টোবর দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বলেছেন, ‘চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যখনই দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রস্তুত হবেন, তখনই নিতে পারবেন। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। তিনি যদি কাল সকালে আবার দায়িত্ব নিতে চান আমার ধারণা, তাতে কোনো সমস্যা হবে না।’
এর পরদিন সকালে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা ছুটি কাটিয়ে দেশে ফিরলে দায়িত্ব নেবেন। সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা স্বেচ্ছায় ছুটিতে গেছেন এবং স্বেচ্ছায় ফিরে এসে দায়িত্ব নেবেন’। তিনি বলেন, ‘এখানে সরকারের কিছু করার নেই, সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই, সরকারের কোনো পরামর্শও নেই।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং হাইকমিশনার মোয়াজ্জেম আলীর এমন বক্তব্য এসেছে মূলত ভারতের চাপে। দিল্লীকে আশ্বস্ত করতেই তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের তরফ থেকে এমন বক্তব্য দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকার যদিও দিল্লীর চাপে এসকে সিনহাকে চেয়ারে বসতে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এখন সেটি পালন করা হবে কিনা তা নিয়ে ইতিমধ্যেই সন্দেহ দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ গত ৫ নভেম্বর এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আবারও পরিষ্কার করে বলেছেন, এসকে সিনহার প্রধান বিচারপতির চেয়ারে বসা সুদূর পরাহত। তারপর থেকে প্রতিদিনই তিনি সংবাদ মাধ্যমে একই বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও এ্কই অবস্থানে রয়েছেন। এদিকে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের নিয়ে আবারও বৈঠক করেছেন রাষ্ট্রপতি। তাছাড়া এরই মধ্যে সরকার পক্ষ থেকে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদনেরও প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। ফলে সবকিছু মিলিয়ে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে আদালত অঙ্গনে। শেষ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি ইস্যুর জের কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা নিয়ে সবাই চিন্তিত।

Top