সোমবার থেকে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন শুরু

Rohinga-8.jpg

নেজাম উদ্দিন, কক্সবাজার। 

হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরনার্থী বাংলাদেশে প্রবেশকারীদের গত সোমবার হতে নিবন্ধন কাজ শুরু করেছে সরকার
মিয়ানমারে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিবন্ধনের আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অপরাধ দমন, ত্রাণ সহায়তা এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যর্পণে সুবিধার লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় রুবিয়া খাতুন নামের এক রোহিঙ্গা নারীকে নিবন্ধন করার মধ্য দিয়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সেখানে তার বয়স : ৬০, বাবার নাম : নাগু, মায়ের নাম : সুফিয়া খাতুন, জন্মতারিখ : অজানা, জন্মস্থান : মিয়ানমার, দেশ : মিয়ানমার এবং জাতীয়তা : রোহিঙ্গা লেখা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক রোহিঙ্গার নাম, ঠিকানা, আঙ্গুলের ছাপ ও ছবিসহ তাদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এ কাজে পাসপোর্ট অধিদফতরের একটি টেকনিক্যাল টিম সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা বিষয়ে খোলা কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) খালেদ মাহমুদ। সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, যেসব রোহিঙ্গা বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের আওতায় আসবে না তাদের কোনো ধরনের সহযোগিতা দেয়া হবে না। ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যর্পণে ও বাংলাদেশে অবস্থানকালীন নিরাপত্তায় বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কাজে লাগবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এদিকে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, সোমবার সকাল থেকে নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরুর কথা ছিল। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও দাফতরিক কিছু সমস্যার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে তা আরম্ভ করা যায়নি। তাই মঙ্গলবার থেকে কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হলেও সুযোগ থাকায় সোমবার সন্ধ্যায় নিবন্ধনের কাজ উদ্বোধন করা হয়। কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ এডিএম খালেদ মাহমুদ জানান, কুতুপালং ক্যাম্পে একটি বুথ চালু করে পাসপোর্ট বিভাগের কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুর রহমান ও লে. কর্নেল শফিউল আজম এ নিবন্ধনের যাত্রা শুরু করেন। প্রথমদিন ১২ জনকে নিবন্ধনের আওতায় আনা সম্ভব হয়। উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘কুতুপালং ও বালুখালীতে দুটি টিমে ২০টি বুথে ছবি তোলা ও নিবন্ধনের কাজ চলছে। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী কুতুপালং থেকে চলে যাওয়ার পর দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার নিবন্ধন সম্পন্ন হয়।’


তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন আসা ও পূর্বের অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিবন্ধনের আওতায় এনে সবাইকে বালুখালীতে শরণার্থী শিবির তৈরি করে সেখানে আশ্রয় দেয়া হবে। এ ছাড়া ইতিপূর্বে বাংলাদেশে ঢুকে কক্সবাজারসহ অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে পড়াদের খুঁজে বের করে এই নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে এবং তাদেরও বালুখালী ক্যাম্পে থাকার ব্যবস্থা করা হবে।’ বায়োমেট্রিক নিবন্ধন প্রক্রিয়া কিভাবে করা হচ্ছে জানতে চাইলে কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ এডিএম খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘প্রত্যেক রোহিঙ্গার নাম, ঠিকানা, আঙ্গুলের ছাপ ও ছবিসহ তাদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্রও দেয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গারাসহ নতুন করে আগতদের বালুখালীতে রাখা হবে। সে লক্ষ্যে রোববার শেড নির্মাণ শুরু হয়েছে। এখানে রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন করে দেড় হাজার একর জায়গায় ক্যাম্প নির্মাণ করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে আসা সব রোহিঙ্গা শরণার্থী এখানে থাকতে পারবেন। এ জন্য আগের অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোর লোকজনকেও বালুখালীতে আনা হবে।’ উল্লেখ্য, আগে আসা নিবন্ধিত ৩২ হাজার রোহিঙ্গার জন্য উখিয়ার কুতুপালং ও টেকনাফের নয়াপাড়ায় নিবন্ধিত দুটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে। এর মাঝে উখিয়ার কুতুপালংয়ে শরণার্থী সংখ্যা ১৪ হাজার এবং নয়াপাড়ায় রয়েছেন ১৮ হাজার। এর বাইরে কুতুপালং ও বালুখালী এবং টেকনাফ উপজেলার লোদা, নয়াপাড়া ও শাপলাপুরে অনিবন্ধিত আরও ৫টি ক্যাম্প রয়েছে। যেখানে আনুমানিক দেড় থেকে দুই লাখ রোহিঙ্গা বাস করছেন। এর বাইরে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের তথ্য জানতে সম্প্রতি রোহিঙ্গা শুমারি হয়। সেই শুমারির তথ্যানুযায়ী দেশে চার লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী মিয়ানমার থেকে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

আর মিয়ানমারে সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে এ পর্যন্ত তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করায় চলতি সপ্তাহেই নতুন করে গড়ে উঠেছে উখিয়ার বালুখালী ঢালার মুখ শরণার্থী শিবির, তাজনিরমারছড়া শরণার্থী শিবির, শফিউল্লাহ কাটা শরণার্থী শিবির ও হাকিমপাড়া শরণার্থী শিবির এবং টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পুঁটিবনিয়া, রইক্ষ্যং ও নাইক্ষ্যংছড়ি বাঁশবাগান এলাকায় ৭টি ক্যাম্প। এসব এলাকায় থাকা রোহিঙ্গাদেরও বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের পর বালুখালীর নতুন শরণার্থী শিবিরে নেয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে উখিয়ার ইউএনও মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘দুই হাজার একর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য। নির্ধারিত এ জায়গার মাঝে বালুখালী ও কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প দুটোই পড়ে। মূলত এ দুটো ক্যাম্পের মাঝখানে যে খালি জায়গা আছে তাতে রয়েছে ৬শ’ একর জমি। আমরা আরও এক্সটেনশন করে নতুন যারা এসেছে তাদের জায়গা দেয়ার জন্য ২ হাজার একর জায়গার প্রস্তাব করেছি। সোমবার পর্যন্ত নির্মিত ২শ’ শেডে ইতিমধ্যে ১৬শ’ পরিবারকে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। বিদ্যুৎ ও রোহিঙ্গাদের সচেতনতার ওপর নির্ভর করবে কত দ্রুত বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন হবে।’ তবে ছড়িয়ে পড়া রোহিঙ্গাদের খুঁজে বের করে এক জায়গায় আনাটা খুব কষ্টসাধ্য হবে বলে উল্লেখ করেন এডিএম খালেদ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের জন্য শেল্টার-টয়লেটসহ এক জায়গাতেই সবকিছু করে দিচ্ছি। যাতে করে সবাই একত্রে থাকতে পারে। বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের কারণে রোহিঙ্গারা যেসব সুবিধা পাবে সেগুলো জানতে পারলে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গারাও এখানে চলে আসবে বলে আশা করছি।’ তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যর্পণের সময় বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কার্ড কাজে লাগবে। রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে যদি মিয়ানমার আপত্তি তোলে সেক্ষেত্রে এটি সহায়ক হবে।’

Top