‘কক্সবাজারের মানুষ রোহিঙ্গাদের সহ্য করতে পারে না’

Tofayel.jpg

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার অঞ্চলে সাংবাদিকতা করছেন তোফায়েল আহমেদ৷ ডয়চে ভেলেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের একটা অংশ কিভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে৷

ডয়চে ভেলে: বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা কী ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে?

তোফায়েল আহমেদ : বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা এমন কোনো অপরাধ নেই যা তারা করছেন না৷ খুন-খারাপি, চুরি-ডাকাতি, এমনকি জঙ্গিবাদেও জড়িয়ে পড়ছেন তারা৷ রোহিঙ্গাদের প্রতি মানুষের আগে যে ভালোবাসা ছিল, আন্তরিকতা ছিল, তাতে এখন ভাটার টান৷ অব্যাহত অপরাধের কারণে লোকজন এখন তাদের সহ্য করতে পারে না৷ আমরা এমনটাও শুনেছি, খুব শিগগিরই কক্সবাজারের মানুষ তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করতে যাচ্ছেন৷ এই আন্দোলনটা হলো তাদের নোয়াখালির ঠ্যাঙ্গারচরে স্থানান্তরের যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে সেটা যেন দ্রুত করে৷

কোন ধরনের জঙ্গিবাদের কথা বলছেন, যাতে এদের সম্পৃক্ততা আছে?

মূলত বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি তাদের সমর্থন নেই৷ তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে না৷ তারা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে৷

 ‘তারা এই রোহিঙ্গাদের অপরাধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে’

১৯৭১ সালে ভারত আমাদের যেভাবে সমর্থন দিয়েছিল, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ মুসলিম অধ্যুষিত হওয়ার পরও তারা আমাদের সমর্থন দেয়নি৷ সেখানে যারা গিয়েছিল, তারা আশ্রয় পায়নি৷ তারা আমাদের প্রতি দয়া-মায়া দেখায়নি৷ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)-র সঙ্গে জঙ্গি কানেকশন আছে বলেই আমরা জানি৷

আইএস-এর মতো কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে এদের সম্পৃক্ততা আছে?

তাদের আইএস-এর সঙ্গে যোগাযোগ আছে কিনা, সে ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই৷ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবে৷ তবে রোহিঙ্গাদের বিশাল একটা জনগোষ্ঠী দেশের বাইরে অবস্থান করে৷ তারা এই ধরনের উগ্র জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে৷ আমরা তো এপার থেকে এমন কথাও শুনেছি যে, রাখাইনে সেনাবাহিনীর উপর যে হামলা হয়েছে, তার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে ৭০০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছিল৷

এরা যে অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে এর পেছনে মূল কারণটা কী? শুধুই কি জীবিকা নির্বাহ, না অন্য কিছু?

একমাত্র জীবিকার জন্য তারা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে, এমনটি নয়৷ বরং অপরাধ করলে তাদের এখানে জীবিকার নিশ্চয়তা থাকে না৷ অথচ অপরাধ না করলে তারা স্বাভাবিকভাবেই জীবিকা নির্বাহ করতে পারত৷ আসলে ওদের জেনারেশনের পর জেনারেশন অপরাধে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে৷ আমরা আব্দুল হাকিম নামে এমন একজন অপরাধীর নাম জানি, যিনি ডাকাতি দিয়ে পেশা শুরু করেছিলেন, এরপর খুন ও চুরি-ডাকাতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন৷ তিনি তো মধ্যপ্রচ্যের জঙ্গিদের আদলে সীমান্তের আস্তানা থেকে ভিডিও বার্তা পাঠান৷ এপারে অপরাধ করলে ওপারে আশ্রয় নেন এবং ওপারে অপরাধ করলে এপারে আশ্রয় নেন৷ সীমান্তের কোনো এক জায়গায় তিনি ঘাপটি মেরে বসে থাকেন৷ আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে হণ্যে হয়ে খুঁজছে৷ কিন্তু কোথাও তাকে খুঁজে পাচ্ছে না৷

এদের কোনো আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা কি আপনারা দেখেছেন?

ওদের আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা আমরা দেখিনি৷ যারা এখানে শরণার্থী হয়ে আসে, তাদের সহযোগিতার নামে এনজিও ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো রাতের আঁধারে ক্যাম্পগুলোতে যায়৷ এসবের মধ্যে কোনো একটা ফাঁক-ফোকর নিশ্চয়ই আছে৷ তা না হলে তারা চুরি করে রাতের আঁধারে কেন সাহায্য করতে ক্যাম্পে যাবে৷ কেন সরকারকে কিছু জানাবে না৷ তারা যদি সহযোগিতা করতে চায়, প্রকাশ্যে করুক৷ কিন্তু গোপনে কেন? এ থেকেই তো বোঝা যায় ওখানে কিছু গলদ আছে৷

এই ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত, তারা কি এখানে এসেই অপরাধে জড়ায়, নাকি যারা দীর্ঘদিন এখানে আছে, তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতাটা বেশি?

বাংলাদেশকে মিয়ানমার থেকে আলাদা করেছে নাফ নদী৷ এই নদী পার হতে মাত্র আধা ঘন্টা লাগে৷ সন্ত্রাসীরা এপারে অপরাধ করে ওপারে চলে যায়৷ আর ওপারে অপরাধ করে এপারে চলে আসে৷ এই কারণে আমাদের এখানে অপরাধ তৎপরতা কমানো যাচ্ছে না, বরং বেড়ে যাচ্ছে৷

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এদের সম্পর্কে কতটুকু অবগত?

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এদের ব্যাপারে অবহিত৷ ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই৷ কক্সবাজারের পাবলিক প্রসিকিউটর, অর্থাৎ পিপি আমাদের বলেছেন, কক্সবাজারে যে ফৌজদারি অপরাধ, তার অধিকাংশেরই আসামি রোহিঙ্গারা৷ কোনো রোহিঙ্গা একবার অপরাধ করে কারাগারে যাওয়ার পর জামিন পেয়ে বের হয়ে আসছে৷ কিন্তু তাকে পুশব্যাক বা অন্য কোনোভাবে মিয়ানমারে পাঠানো যাচ্ছে না৷ মিয়ানমার তাকে নেয় না৷ ফলে সে বাংলাদেশেই থেকে যাচ্ছে৷ আবার নতুন করে অপরাধে জড়াচ্ছে৷ তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর কোনো প্রক্রিয়া না থাকায় তারা ভয়ও পায় না৷ রেহাই পেয়ে যাওয়ার কারণে তাদের মধ্যে অপরাধ তৎপরতা বেড়েছে বলে আমার মনে হয়৷

আরো রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে

আমাদের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা কি তাদের কোনো ধরনের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন?

রাজনৈতিক নেতারা তাদের প্রশ্রয় দেয়, এটা সত্য নয়৷ রাজনৈতিক নেতারা কেন তাদের প্রশ্রয় দেবেন? তবে হ্যাঁ, একজন ইউপি মেম্বার ও একজন ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ ছিল৷ ওই চেয়ারম্যান বেশ কিছু রোহিঙ্গাকে ভোটার করে৷ এবং ওই চেয়ারম্যানের ছত্রছায়ায় বেশ কিছু রোহিঙ্গা বেপরোয়া হয়ে উঠে৷ আবার জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দল আছে৷ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা এই রোহিঙ্গাদের অপরাধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে৷ এমনকি তাদের প্ররোচনায় রোহিঙ্গারা জঙ্গি হয়ে উঠছে- এমন কথাও আমাদের কানে আসে৷

Top