রোহিঙ্গারা কি জিহাদিস্ট?

Rohinga-5.jpg

রোহিঙ্গারা কি জিহাদিস্ট?

রোহিঙ্গাদের- অথবা নিদেন পক্ষে কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গাদের- এখন জিহাদিস্ট নামে অভিহিত করে তুলে ধরা হচ্ছে সন্ত্রাসী হিসেবে। বলা হচ্ছে, এরা কাজ করছে মিয়ানারের সৈন্যদের ও বেসামরিক লোকদের হত্যা করতে। অং সান সু চিসহ মিয়ানমারের নেতারা কথা বলছেন এই সুরেই। রোহিঙ্গা সম্পর্কে এই ধারণা মিয়ানমার সরকার ছড়িয়ে দিচ্ছে বড় ধরনের উদ্দীপনা নিয়ে সেই তখন থেকে, যখন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (এআরএসএ) একটি ছোট্ট সশস্ত্রদল মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর। সেই আক্রমণ এখনো অব্যাহত সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতেও। এই নতুন ধরনের সহিংসতার ঢেউয়ের মাঝে অভিযোগ উঠেছে, মিয়ানমারের ১২ জন নিরাপত্তারক্ষী নিহত হয়েছে। অপর দিকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী হত্যা করেছে ৭৭ জন রোহিঙ্গা মুসলমানকে।

যেভাবে অং সান সু চি ও তার সরকারের সহকর্মীরা এই সঙ্ঘাত সৃষ্টি করেছে, তাতে সামরিকবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে চলা নির্মম হতাযজ্ঞের কথা এড়িয়ে চলেছে। রোহিঙ্গাদের ওপর রাষ্ট্রীয় ও অন্যান্য বাহিনীর দমন-নিপীড়নের প্রামাণ্য দলিল বিস্তারিতভাবে তৈরি করেছে জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল ও অনান্য স্বাধীন মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো। এটি সুবিদিত, কমিউনিটি হিসেবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয় ১৯৮২ সালে। তাদের বঞ্চিত করা হয় যাবতীয় মানবাধিকার, তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন, কারাগারে আটক রাখা হয়, বাধ্য করা হয় নিজ প্রদেশভূমি থেকে বের হয়ে যেতে। এ কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মানবেতর জীবনযাপন করছে বাংলাদেশে অথবা বাঁচার জন্য লড়াই করছে মালয়েশিয়া থেকে সৌদি আরব পর্যন্ত বেশ কয়েকটি দেশে। জাতিসঙ্ঘ এদের বর্ণনা করেছে বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ((world’s most persecuted minorities) হিসেবে। নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের সরল কথা হচ্ছে : রোহিঙ্গারা ‘স্লো জেনোসাইডে’র শিকার।

রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো ও ব্যাপকভাবে তাদের একপ্রান্তে ঠেলে দেয়ার বিষয়টিকে আমলে না নিয়ে রোহিঙ্গাদের ক্ষুদ্র একটি অংশের সহিংসতা নিন্দা করা সত্য ও ন্যায়বিচারের প্রতি একটি প্রহসন বৈ আর কিছু নয়। চরম বেপরোয়া ও হতাশাজনক অবস্থায় পড়ে তাদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে সহিংসতার পথে গেছে। অবশ্য, সহিংসতা কোনো সমাধান নয়। এটি রোহিঙ্গাদের অধিকার, বিশেষ করে তাদের নাগরিকত্বের অধিকার পুনরুদ্ধারের সহায়ক হবে না।
আমাদের উদ্বেগ, সহিংসতা আরো বাড়বে। এর ইঙ্গিত এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এই দ্বন্দ্বে যোগ হয়েছে ধর্মীয় গুঢ়ার্থÑ যদিও এই দ্বন্দ্বের দৃশ্যমান শেকড় নিহিত ছিল না ধর্মের মাঝে- এখন মনে হচ্ছে, এই সহিংসতা মিয়ানমারের সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে এবং এই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলমান ও বৌদ্ধ সমাজকে। এটি বিপর্যয়কর হবে আসিয়ানের জন্য। আসিয়ান হচ্ছে একটি আঞ্চলিক গোষ্ঠী, যে অঞ্চলের ৪২ শতাংশ জনগোষ্ঠী মুসলমান। আর ৪০ শতাংশ বৌদ্ধ।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা দ্বন্দ্বের একটি কার্যকর সমাধান বের করা সে কারণে একটি চরম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের সভাপতিত্বে প্রণীত ‘Final Report of the Advisory Commission on Rakhine State’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি সব অংশীজনের জন্য জরুরিভিত্তিতে বিবেচনায় নেয়ার দাবি রাখে। ২০১৭ সালের আগস্টে ঘোষিত এই প্রতিবেদনে আহ্বান জানানো হয় ১৯৮২ সালের সিটিজেনশিপ আইন পর্যালোচনা করে দেখতে। এতে উল্লেখ করা হয়: ‘Myanmar harbours the largest community of stateless people in the world.’ এর সার কথা হচ্ছে, মিয়ানমারে রয়েছে বিশ্বে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর একটি সমাজ। প্রতিবেদনে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়, বিভিন্ন ধরনের নাগরিকদের মধ্যে সব ধরনের বৈষম্য দূর করতে।

এই রিপোর্টে অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে রাখাইন রাজ্যেও মানুষের দারিদ্র্য কমানোর সুপারিশও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সেখানে দরিদ্র মানুষের হার ৭৮ শতাংশ। সুপারিশে বলা হয়েছেÑ সেখানকার মানুষের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়ন করতে হবে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশের সুযোগ জোরদার করাতে হবে, রোহিঙ্গাদের অবাধে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাসহ জনগণের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব করার ব্যাপারটি উৎসাহিত করতে হবে। যদিও এই রিপোর্টের শব্দ চয়নে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে কূটনৈতিক দিকের প্রতি, তবুও মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর প্রতি সুস্পষ্ট বার্তা দেয়া হয়েছে: ‘স্থিতাবস্থা চলতে দেয়া যাবে না এবং পরিবর্তন আনতেই হবে।’ বার্তাটি এ বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ যে, রিপোর্ট প্রণয়নকারী এই কমিশনের সূচনা করেছে সে দেশের সরকার। সরকার কি এ ব্যাপারে কান দেবে? এ পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে, সরকার কমিশনের সুপারিশগুলোর প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেবে। এতে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। রোহিঙ্গাদের আলাদা জাতিগোষ্ঠী হিসেবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার বিষয়টি নিহিত সামরিক সরকারের কর্তৃত্বপরায়ণতার মাঝে। রিপোর্টে বলা হয়- আমরা আজ দেখছি, এর ফলে সেখানে চলছে গণহত্যা।

এমনকি মিয়ানমার সরকার যদি এর নিজের সঙ্কল্পশক্তি কাজে না লাগায়, তখন কফি আনানের রিপোর্টটিকে কাজে লাগানো যেতে পারে মিয়ানমার সরকারকে তা বাধ্য করতে অন্যান্য সরকারের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করার মাধ্যমে। আসিয়ান দেশগুলোর সরকারের বাইরের অন্যান্য দেশের সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে বেইজিং, জাপান, নয়াদিল্লি, ইসলামাবাদ, ওয়াশিংটন ও লন্ডনকে বিষয়টি বোঝানোর। এরা এই মর্মে দাবি তুলতে পারে, মিয়ানমার সরকারকে এর নাগরিকদের মধ্যে কোনো ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি না করে সব নাগরিককে সুরক্ষা দিতে হবে। যদি মিয়ানমার সরকার তা করতে ব্যর্থ হয়, এসব দেশের রাজধানীগুলোকে (সরকারগুলোকে) নে পি থো’র (মিয়ানমারের আধুনিক রাজধানী) সাথে তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করে দেখতে হবে।

নে পি থো’র নেতৃত্বকে তাদের আচরণ পাল্টানোর ব্যাপারে রাজি করানোর লক্ষ্যকে সামনে রেখে ‘পার্মানেন্ট পিপল’স ট্রাইব্যুনাল’ (পিপিটি) এর রোহিঙ্গাদের প্রতি আচরণবিষয়ক সমাপনী অধিবেশনের আয়োজন করতে যাচ্ছে কুয়ালালামপুরে, আগামী ১৮-২২ সেপ্টেম্বরে। অধিক থেকে অধিক হারে সমবেদনার কণ্ঠ আজ উচ্চারিত হচ্ছে নিপীড়িতদের পক্ষে ন্যায়বিচারের দাবিতে। কারণ এরা জানেন, শেষ পর্যন্ত এরা একদিন নে পি থো’র দেয়াল ভেদ করতে সক্ষম হবে।

লেখক : মালয়েশিয়াভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল মুভমেন্ট
ফর অ্যা জাস্ট ওয়ার্ল্ড’-এর প্রেসিডেন্ট,
কাউন্টার কারেন্টস থেকে ভাষান্তর : গোলাপ মুনীর

Top