জিয়ার রাষ্ট্রীয় খেতাব বাতিল বিতর্ক

বিএনপি গত এক যুগেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে অবস্থান করছে। সরকারের সিদ্ধান্তে দুর্নীতির মামলার সাজা স্থগিত করার পর দলটির শীর্ষ নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড না করার শর্তে জামিনে মুক্ত হয়ে নিজ গৃহে অনেকটা বন্দিজীবনযাপন করছেন। বিএনপির আরেক শীর্ষ নেতা তারেক রহমান খুনের দণ্ডসহ কয়েকটি মামলা মাথায় নিয়ে নির্বাসনে বিদেশে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য দেয়া রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘বীরউত্তম’ কেড়ে নেয়ার সুপারিশ করেছে সরকারের একটি কমিটি। মামলা-হামলায় জর্জরিত বিএনপির জন্য এটি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি নিয়ে রাজনীতিতে এখন দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীরশ্রেষ্ঠ’র পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদক হিসেবে ৬৮ জনকে ‘বীরউত্তম’ খেতাব দেয়া হয়েছিল এবং এই তালিকায় তিন নম্বরে ছিল জিয়াউর রহমানের নাম। পত্রিকায় দেখলাম, স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রীয় সে খেতাবটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)। গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১ জামুকার ৭২তম সভায় একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি শরিফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী ও মোসলেহ উদ্দিনের রাষ্ট্রীয় খেতাবও বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। জিয়াউর রহমানসহ এই পাঁচজন এবং তাদের পরিবার মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন না।

জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে- বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় জড়িত থাকা, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের দেশত্যাগে সহায়তা এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন, সংবিধান লঙ্ঘন, ’৭১ সালের স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসনসহ আরও নানা অভিযোগ। কাউন্সিলের একই বৈঠকে, খন্দকার মোশতাক আহমেদের নাম মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ‘স্মরণীয় বরণীয়’ ব্যক্তি হিসেবে যে রাষ্ট্রীয় তালিকায় রাখা হয়েছে, সেখান থেকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত এখনই কার্যকর হচ্ছে না, এটা নির্ভর করছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওপর। তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একটা কমিটি গঠন করা হবে, যারা এটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে।

দেখলে মনে হতে পারে এমন সুপারিশ হঠাৎ করে এসেছে কিন্তু বাস্তবে তা নয়। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে দীর্ঘদিন ধরে। বলা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জেনারেল জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি যেভাবে জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে, একইভাবে জিয়ার মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগও মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দেশের দুই প্রধান দলের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ বিরোধ দীর্ঘদিনের বলাই যায়। তবে জিয়াকে বিএনপি যেমন ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে দালিলিকভাবে প্রমাণ করতে পারেনি তেমনি আওয়ামী লীগও জিয়াকে অমুক্তিযোদ্ধা প্রমাণ করতে পারেনি। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ অবশ্য জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা কিনা এই বিতর্কে যাওয়ার চেয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার ভূমিকা নিয়ে তার মরণোত্তর বিচার এবং ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে পটপরিবর্তনের নেপথ্যে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা তদন্তের কথা বলছে।

দুই দলের এই বিতর্কের মধ্যে সাধারণ মানুষের কাছে এটা প্রতিষ্ঠিত যে জাতির এক ক্রান্তিকালে মেজর জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন। তার ডাকে সর্বস্তরের মানুষ তখন অনুপ্রেরণা পেয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ কয়েক বছর ধরে জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার যে অভিযোগ করছে, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুনর্বাসনের যে অভিযোগ করছে, গোলাম আযমসহ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে রাজনীতিতে আনার যে অভিযোগ করছে; বিএনপি তার জুতসই জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপির কর্মকাণ্ড এখনো স্বাধীনতাবিরোধী এবং ’৭৫ এর হত্যাকারীদের পক্ষেই পরিচালিত হয়ে আসছে।

ইতিহাসে কিছু পেতে হলে দুনিয়ার সব জাতিকে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। আমরা আমাদের দুর্লভ ধন স্বাধীনতা পেয়েছি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দুর্গম পথ বেয়ে। এতে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের সবার সমর্থন পাননি, অবশ্য সিংহভাগ মানুষের সমর্থন ছিল তার নেতৃত্বে প্রতি। যারা সমর্থন করেনি তারা গত ৫০ বছরে সুসংগঠিত হয়ে এখন প্রতিশোধ নিতে উদত্ত। বাংলাদেশের সব অর্জন এখন তারা ছারখার করে দিতে চায়। ইতিহাস সাক্ষী দেয় বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে সুসংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।

পাকিস্তানফেরত সামরিক অফিসারদের ইচ্ছানুসারে জেনারেল জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠন করেছিলেন। বহু রাজনৈতিক দল থেকে লোক এনে এই দল গঠন করা হয়েছিল। সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে যেভাবে দল গঠন করে, এই দলটির জন্ম কাহিনিও অনুরূপ। দলটিতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যক্তিদের সমাবেশ হয়েছিল বেশি। শাহ আজিজ, মশিউর রহমান, আব্দুর রহমান বিশ্বাস, বিচারপতি আব্দুস ছাত্তার, আব্দুল আলিমসহ বিএনপি গঠনকালীন যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা সবাই ছিলেন পাকিস্তানের পক্ষের লোক। দালাল আইনে বিচারপতি ছাত্তার ছাড়া সবাই জেলে ছিলেন। তবে বিএনপির গঠনকালীন মহাসচিব ডা. বদরুদোজ্জা চৌধুরী দালালও ছিলেন না, আবার মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন না।

জিয়াউর রহমান ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। ১৯৭৫-এর নভেম্বরের পরে যখন তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তখন তিনি আওয়ামী লীগবিরোধী সব এলিমেন্টস জড়ো করেছিলেন তার রাজনৈতিক স্বার্থে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ করেছেন, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’কে তার জায়গায় প্রতিস্থাপন করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধে খন্দকার মোশতাক যে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন, জিয়াউর রহমান সেটিকে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের অংশ করেন। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে যে ধারায় রাজনীতি করে এসেছেন, বর্তমান বিএনপি বরং আরও একধাপ এগিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে প্রকাশ্যে রাজনীতি করছে, একমঞ্চে বক্তৃতা করছে।

এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জিয়াউর রহমানের খেতাব আওয়ামী লীগ সরকার কেড়ে নিতে পারে কিনা- যখন কোনো আদালতে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিচার হয়নি এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায়ও তিনি অভিযুক্ত না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার ইচ্ছে করলে সেটা পারে, কারণ দুনিয়ার বহু দেশে খেতাব দিয়ে পরবর্তীতে নানা কারণে কেড়ে নেয়ার নজির রয়েছে। পাকিস্তান আমলেও অনেক বাঙালিকে খেতাব দিয়ে পাকিস্তান সরকার পরবর্তীতে কেড়ে নিয়েছে। জিয়ার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা দায়ের করা যায়নি কারণ তিনি তখন মৃত। মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনে বিচার হয় না। এই পরিস্থিতিতে খেতাবই কেড়ে নেয়া যায় শুধু, তবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জিয়ার নাম খারিজ করার কোনো সুযোগ নেই।

অবশ্য জিয়াউর রহমানের খেতাব কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত শিগগিরই হবে বলে মনে হচ্ছে না। তাছাড়া জিয়ার খেতাব কেড়ে নেয়া জরুরি কি-না সেটাও এখন রাজনীতিতে দীর্ঘ বিতর্কের ইস্যু।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
anisalamgir@gmail.com

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.